কাপাসিয়ায় লাখ টাকা ঘুষ চেয়ে তহশিলদার বাবলু বললেন, নদীর পানি সাগরে নিয়া ঢালুন লাগে! (ভিডিও)
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের কাপাসিয়ার টোক নয়ন বাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া শুধু ধূর্ত নন, বাটোয়ারায়ও পারদর্শী। বড় বড় ফাইলের বাণিজ্য তিনি একা করেন না, কর্তার অংশও বুঝিয়ে দেন। এই গুণের কারণে ভূমি কর্মকর্তাদের মধ্যে তার কদর বেশি, থাকছেনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তাদের লাগামহীন কর্মকাণ্ড নিয়ে ঘটনার আড়ালের এবারের পর্ব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া কাজভেদে বিভিন্ন হারে ঘুষ আদায় করেন। তাকে টাকা না দিলে হয়রানির শেষ নেই। সাধারণ নামজারিতে তার সর্বনিম্ন রেট তিন হাজার টাকা। জমির পরিমাণ ও নামজারির ধরন অনুযায়ী তা বাড়তে বাড়তে লাখ থেকে কয়েক লাখ টাকা হয়।
টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আওতাধীন সিংহশ্রী ইউনিয়নের নামিলা এলাকার মৃত আবদুল মান্নানের নামে বন্দোবস্তকৃত ১ একর ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে। বন্দোবস্তের নির্ধারিত সময় পর এ ধরনের জমির নামজারি ও জমাভাগ এবং ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান স্বাভাবিক নিয়মেই হয়। নিয়ম অনুযায়ী তার ওয়ারিশরা নামজারির জন্য সরাসরি ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বাবলু মিয়া তার অফিস রুমের চেয়ারে বসে সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ দাবির ভিডিওটি ঘটনার আড়ালের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার সামনে দুজন বয়স্ক ব্যক্তি বসে আছেন। বাবলু মিয়ার হাতে কাগজপত্র দিয়ে সেবাপ্রার্থী পাশে দাঁড়িয়ে ওয়ারিশ সংখ্যার বর্ণনা দিচ্ছেন। কথা শোনে বাবলু মিয়া বলছেন, জমিও তো অনেক। আপনারা তো পাইছেন জাগা (জায়গা) টাকা ছাড়াই, এহন কিন্তু খরচ হইব। আমি কিন্তু স্ট্রেট ফরোয়ার্ড (সোজাসাপটা) কথা কই। দেড় শ ডেসিমল দিছে যহন মাংনাই (মাগনা), এহন কিন্তু মাংনা খারিজ হইব না এইডা।
বাবলু মিয়া সেবাপ্রার্থীকে বলেন, আমি তো চাকরি করি, বোঝেন না? আমি অফিসারের বাইরে কিছুই কইয়া পারুম না। পরে তিনি সেবাপ্রার্থীকে আরও কাছে ডেকে নিয়ে নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে যান। অঙ্কে টাইপ করেন এক লাখ টাকা। বাবলু মিয়া তাকে সংখ্যাটি দেখিয়ে বলেন, খাজনাও তো অনেক হইব। খাজনা-টাজনাসহ একবারে এইডা নিমু, পুরা।
বাবলু মিয়া সেবাপ্রার্থীকে বলেন, যদি সাহস থাকে, তাইলে কন। তখন সেবাপ্রার্থী টাকার পরিমাণ অনেক হয়ে যায় বললে বাবলু মিয়া বলেন, এগুলো বলা যায় না তো, গরিব মানুষ দেইখা কইয়া দিছি, ঝামেলা আছে। আমরা তো বাস করি সাগরে, বোঝেন নাই ঘটনা? নদীর পানি সাগরে নিয়া ঢালুন লাগে, ঝামেলা হইল ঐ জায়গায়। আটজন তো (ওয়ারিশ), বেশি হইব না, ব্যাপার না। আমি স্যারের সাথে আলাপ কইরা ভূমির হিসাব অর্ডার করাইয়া আইন্না খাজনা দিয়া দিমু।
এ ব্যাপারে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি ঘটনার আড়ালের কাছে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, নামজারির বড় বড় আবেদনের মধ্যে বন্দোবস্তকৃত জমির আবেদনকেও বড় হিসেবে দেখা হয়। তাই ঘুষের লক্ষ্য থাকে বড়। আগে দেড় একরের ফাইলে উপজেলা ভূমি অফিসে ‘এলআর’ নামে নেওয়া হতো ৩০ হাজার টাকা। বর্তমান এসিল্যান্ডের যোগদানের পর নতুন রেট হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। বাবলু মিয়া তার অফিসার বলতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অর্থাৎ এসিল্যান্ডকে বুঝিয়েছেন।
এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদুল হকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার একটি সূত্র জানায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া একজন চিহ্নিত দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা। তাকে বিভিন্ন সময়ে কয়েকবার সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও দৌরাত্ম্য থামেনি। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় মামলা রুজু হয়ে কার্যক্রম চলছিল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তদবির করে তা চাপা দেওয়া হয়।
এদিকে সাপ্তাহিক ঘটনার আড়ালের গত ১৫ জুনের সংখ্যায় ‘কাপাসিয়ার টোক ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়া, তহশিলদার বাবলু বেপরোয়া’ শিরোনামে একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে চলে ব্যাপক তোলপাড়।
পরে সাংবাদিক নামধারী এক দালাল ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বাবলু মিয়ার কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটি অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টালে প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার এ ধরনের বিজ্ঞাপন কাণ্ড বিধিবহির্ভূত। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন : কাপাসিয়ার টোক ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়া, তহশিলদার বাবলু বেপরোয়া
ঘুষ দাবির ভিডিও :



