কাপাসিয়ার টোক ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়া, তহশিলদার বাবলু বেপরোয়া

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া। যেখানেই যান, ঘুষ-দুর্নীতিতে আলোচিত হন। কয়েকবার বরখাস্তও হয়েছেন, কিন্তু তাতে কী! দুই হাতে কামিয়ে এক হাতে খরচ করেন, মিলে যায় মুক্তি!

অভিযোগ অসংখ্য, তবুও ঘুরেফিরে গাজীপুরের বিভিন্ন তহশিল অফিসেই আছেন বাবলু মিয়া। অবসরের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। এমন বাজিমাতের ভাগ্য কজনের কপালেই বা জুটে!

বাবলু মিয়া জেলার কাপাসিয়া উপজেলার টোক নয়ন বাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দেড় বছর আগে যোগদান করেন। যোগ দিয়েই তিনি শেষ সময়ের বাণিজ্যে মেতে ওঠেন। টাকা ছাড়া যেন কিছুই খান না!

ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া দেড় বছরেই অফিসটিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। ফলে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রার্থী জনসাধারণ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া টাকা ছাড়া কাজ করেন না। জমির নামজারি ও জমাভাগ এবং মিসকেসের তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে বিভিন্ন হারে ঘুষ দিতে হয়। দাবিকৃত টাকা না দিলে হয়রানির শেষ নেই। সিংহশ্রী ও রায়েদ ইউনিয়নও টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অধিভুক্ত। সে হিসাবে আয়তন বেশ বড়।

ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া জমির নামজারিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা, ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ৬ হাজার টাকা, ১০০ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা, ১৫০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ২০ হাজার টাকা নেন। এভাবে জমির পরিমাণ বাড়তে থাকলে ঘুষের রেটও দ্বিগুণ হতে থাকে। আর কাগজপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে মোটা অঙ্কের চুক্তি ছাড়া কাজ হয় না।

রায়েদ ইউনিয়নের রায়েদ শেখপাড়া এলাকার শেখ মো. কামাল হোসেন গং গত বছরের ৬ আগস্ট প্রায় সাড়ে ৬ একর জমির নামজারির জন্য আবেদন করে। আবেদন নম্বর ১২৬০৬২৯১। উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদনের জন্য টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠালে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া আবেদনকারীকে ঘোরাতে থাকেন।

একপর্যায়ে বাবলু মিয়া কাজটি করে দিলে তাকে কত টাকা দেওয়া হবে জানতে চান। তখন আবেদনকারী দুই-তিন হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেন। পরে দরকষাকষি করে বাবলু মিয়া ২০ হাজার টাকায় রাজি হন।

টাকা দেওয়ার দিন শেখ কামাল হোসেন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার রুমে গিয়ে টেবিলে টাকা রাখতে চান। তখন বাবলু মিয়া সিসি ক্যামেরা থাকার কথা বলে তাকে সিঁড়ির নিচে দাঁড়াতে বলেন। পরে বাবলু মিয়া এক কর্মচারী পাঠিয়ে তার কাছ থেকে টাকা নেন।

টাকা পেয়েই বাবলু মিয়া কাজ শুরু করেন। তিনি গত ১৯ আগস্ট নামজারির সুপারিশ করে উপজেলা ভূমি অফিসে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেন। সেখানে দেখা দেয় আরেক বিপত্তি।

উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও কানুনগো আবেদনকারীর কাছে মূল দলিলপত্র চান। তিনি সব উপস্থাপন করেন। কিন্তু নামজারি আর অনুমোদন হয় না।

পরে শেখ কামাল হোসেন অফিসের নাজির শিব্বির আহমেদের স্থানীয় এক আত্মীয়ের দ্বারস্থ হন। ওই আত্মীয় শিব্বির আহমেদকে ফোন করে বলে দিলে শেখ কামাল হোসেন তার সঙ্গে দেখা করেন। তখন শিব্বির আহমেদ তার পক্ষে ওই আত্মীয় কথা বলবেন বলে তাকে চলে যেতে বলেন।

এরপর শিব্বির আহমেদের আত্মীয় শেখ কামাল হোসেনকে প্রথমে তিন লাখ ও পরে দুই লাখ টাকার কথা জানান। তিনি এত টাকা দিতে না পারায় শেষে গত ৫ নভেম্বর আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়।

ভুক্তভোগী শেখ কামাল হোসেন ঘটনার আড়ালে-কে জানান, ভূমি অফিসের লোকজন টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। আবারও আবেদন করলে একই অবস্থা হওয়ার আশঙ্কায় তিনি আর আবেদন করেননি।

এ ব্যাপারে নাজির শিব্বির আহমেদের সঙ্গে মোবাইলে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিলি কল ধরেননি।

সিংহশ্রী ইউনিয়নের নামিলা এলাকার মৃত আবদুল মান্নানের ওয়ারিশরা বন্দোবস্ত সূত্রে প্রাপ্ত দেড় একর জমির নামজারির জন্য ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি কাগজপত্র দেখে এক লাখ টাকা দাবি করেন।

পরে সেবাপ্রার্থীরা আর আবেদন করার সাহস পাননি। বাবলু মিয়ার রুমে ধারণকৃত এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ঘটনার আড়ালের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দুজন বহিরাগত লোক সরকারি কর্মচারীর মতো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তারা হলেন পার্শ্ববর্তী সুলতানপুর এলাকার মাসুদ ও শ্রীপুরের আজিজুল। ভূমি কর্মকর্তারা বেশির ভাগ ঘুষের টাকা তাদের মাধ্যমেই নেন। সুযোগ পেয়ে তারাও ধান্ধাবাজিতে মেতে উঠেছেন।

জানতে চাইলে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বাবলু মিয়া ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তিনি কারও কাছ থেকে টাকা নেননি। এসব অভিযোগ মিথ্যা।

আরও পড়ুন : কাপাসিয়া এসিল্যান্ড অফিসে দুর্নীতির রাজত্ব, মাহবুব সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায়?

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker