গাজীপুরে ‘বনভূমির ক্ষতিসাধন’ করে গ্যাসলাইন স্থাপন করছে ‘বনভূমি দখলকারী’ হেলথকেয়ার ফার্মা!
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরে সংরক্ষিত বনভূমির ক্ষতিসাধন করে গ্যাস সংযোগের লাইন স্থাপন করছে বনভূমি জবর দখলকারী হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
গত কিছুদিন ধরে এই তৎপরতা চললেও বন কর্মকর্তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এতে উদ্ধারের শর্তে থাকা বনভূমি উদ্ধারের প্রক্রিয়া আটকে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তার পশ্চিমে বাংলাবাজার সড়কের পাশে গজারিয়াপাড়া এলাকায় ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড অবস্থিত। দুই যুগ আগে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের সময় বাউপাড়া বিটের আড়াইশ প্রসাদ মৌজার সিএস ১৫৬ ও ১৬২ নং দাগের ২০ ধারা ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখল শুরু হয়। দুটি দাগে জবর দখলকৃত বনভূমির পরিমাণ ৪০ শতাংশ। ১৫৬ নং দাগের ৩৫ শতাংশ বনভূমি দখলের ঘটনায় ২০১০-২০১১ সালে একটি পিওআর মামলা দায়ের করে বিট অফিস।
এ ছাড়া হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়েরের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব প্রেরণ করে বন বিভাগ। পরে ২০২০ সালে একটি উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের করা হয়। মোকদ্দমা নম্বর ৪/২০২০। কিন্তু কার্যক্রম আর এগোয়নি।
জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তার বিধানকল্পে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কোর জোন হিসেবে ঘোষিত হয়। কোর জোনে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন ও পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ২০১২ সালের পূর্বে স্থাপিত হওয়ায় আইনগত বাধার মুখে পড়তে হয়নি। এরপরও প্রতিষ্ঠানটির মালিক আইন অমান্য অব্যাহত রাখেন। একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করে স্থাপন করতে থাকেন কারখানার বিভিন্ন ইউনিট। ফলে বিরূপ প্রভাবের মুখে পড়ে বন ও বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ২০১৯ সালে বনভূমির ভেতর দিয়ে গোপনে একটি গ্যাস সংযোগের লাইন স্থাপন করে। ওই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের তখনকার রেঞ্জ কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান মিয়া। যার স্মারক নম্বর ২০১৯-৩৪৫৬। কিন্তু শেষে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বারবার পার পেয়ে যাওয়া হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবার বনভূমির ভেতর দিয়ে দ্বিতীয় গ্যাস সংযোগের লাইন স্থাপনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাংলাবাজার সড়কের গ্যাসলাইনের সংযোগস্থল থেকে ভেকু দিয়ে খননকাজ শুরু হয়েছে। প্রথমে কিছু জোতভূমি ও পরে বনভূমি পার হয়ে কারখানার ভূমি। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনভূমির আকৃতি ও বাস্তুসংস্থান।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ২০২১ সালে বন বিভাগের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি আবেদন করে। মোকদ্দমা নম্বর ৫৫/২০২১। পরে বন বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০২২ সালে তা অনুমোদন করে জেলা প্রশাসন।
তবে ডিমারকেশনটির তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন ও কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বাউপাড়া বিটের সাবেক বিট কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তিতে এসব করেছেন বলে অভিযোগ।
নানা দুর্নীতিতে আলোচিত মোনায়েম হোসেন বর্তমানে চট্টগ্রামে আছেন। শাস্তির বদলে পুরস্কার হিসেবে তিনি গত বছর ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
ডিমারকেশনের সময় হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস জবর দখলকৃত বনভূমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের লিখিত অঙ্গীকার করলেও তা অদ্যাবধি হস্তান্তর করেনি। কারখানায় যাতায়াতের জন্য বাংলাবাজার সড়ক থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে একটি নতুন রাস্তা করার চুক্তিপত্র দাখিল করা হলেও সেটা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এখন গ্যাস সংযোগের দ্বিতীয় লাইন স্থাপনের মধ্য দিয়ে দখল আরও পোক্ত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গাজীপুর আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সুরুয আলমের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের গ্যাসলাইন স্থাপনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ২০২৬ সালে বনভূমি বিনিময়ের যে আইন হয়েছে, হেলথকেয়ার সেই আইনে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে বলে শুনেছি। এখনো অনুমোদন হয়নি।
একজন বন কর্মকর্তা বলেন, কোনো কারখানার অভ্যন্তরে বিক্ষিপ্তভাবে বনভূমি থাকলে নতুন আইন অনুযায়ী সেটা শর্ত সাপেক্ষে বিনিময়ের সুযোগ আছে। হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ভেতরে যদি বনভূমি বিক্ষিপ্তভাবে না থাকে, ডিমারকেশনের বর্ণনা অনুযায়ী যদি বিকল্প রাস্তার সুযোগ থাকে, তাহলে তাদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বন ও বনভূমি রক্ষায় অধিক সতর্ক থাকা উচিত।



