শ্রীপুরে বনের জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি, সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা বেপরোয়া

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতি জমে উঠেছে। বাড়তি টাকা ছাড়া মিলছে না সেবা। ফলে জনসাধারণকে পোহাতে হচ্ছে ব্যাপক ভোগান্তি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। যোগ দিয়েই তিনি ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে দিন দিন বাড়তে থাকে ভোগান্তি।

ছয় মাসের মধ্যেই দলিল লেখক ও স্ট্যাম্প ভেন্ডার সমিতির সদস্যরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা দলিল সম্পাদন বন্ধ রেখে তিন দিনের শাটডাউন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানার দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

এর পরও থামেননি সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি বীরদর্পে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

বনের জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি : সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা চাহিদামতো টাকা পেলে বড় বড় দুর্নীতি করতেও পিছপা হন না। দেখেন না রাষ্ট্রের স্বার্থ। তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো অফিস চালাচ্ছেন। লেনদেনের জন্য উমেদার জাহিদকে পিএস হিসেবে নিয়োগ করেছেন।

উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ী মৌজার সিএস ৫৩ নং দাগের জমি বন বিভাগের নামে গেজেটভুক্ত। ওই দাগের সাড়ে ৩৩ শতাংশ জমি কিনেছেন ঢাকার উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর রোডের বাসিন্দা তৌহিদুল আলম মিলকি। তিনি গোডাউন নির্মাণ করে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ভাড়া দেওয়াসহ রিসোর্টের ব্যবসা করেন।

তৌহিদুল আলম মিলকির কাছে দাতা সেজে ওই গেজেটভুক্ত বনভূমি বিক্রি করেছেন ফেনী সদর উপজেলার চাড়িপুর এলাকার শফিকুর রহমানের ছেলে আবদুর রহিম নাহিদ। তিনি তৌহিদুল আলম মিলকির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

তৌহিদুল আলম মিলকি ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ওই বনভূমি কেনার পর গত বছরের ১৯ নভেম্বর শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তার নামে সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিল নম্বর ১২৯৮২/২৫। সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে চুক্তি করে রেজিস্ট্রি করিয়ে দিয়েছেন তেলিহাটি ইউনিয়নের উত্তর পেলাইদ এলাকার দলিল লেখক হাদিউল ইসলাম। তার সনদ নম্বর ১১১।

দলিলটি রেজিস্ট্রিতে কিছু কৌশলেরও আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অবস্থান অনুযায়ী জমির তফসিলে সিএস ৫৩ নং দাগের পরিবর্তে জোত দাগ এসএ ৫৭০ উল্লেখ রয়েছে। তবে আরএস হিসেবে যে ১০৬৯ নং দাগ উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা ৫৩ নং দাগ থেকে সৃষ্ট। অর্থাৎ আরএস দাগের সঙ্গে ওই এসএ দাগের কোনো যোগসূত্র নেই।

এ ছাড়া দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, দাতা আবদুর রহিম নাহিদ ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর উপজেলা ভূমি অফিসের ১০৪০/২০২০-২১ নম্বর নথির আদেশ মোতাবেক নামজারি ও জমাভাগ করে খাজনা পরিশোধ করেছেন। উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, খারিজের এই নথি জাল। এটা ওই বছরের হলেও তেলিহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের টেপিরবাড়ী মৌজার নয়, রাজাবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রহলাদপুর মৌজার। আর আবেদনকারী ব্যক্তিও এক নয়, নথিটি অনুমোদিত হয়েছে গাজীপুর সদরের সুলতান উদ্দিনের নামে। দাগ ও খতিয়ান নম্বরসহ আবেদনের সব তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এদিকে দাতা আবদুর রহিম নাহিদ ২০১০ সালের ২৭ এপ্রিল রেজিস্ট্রিকৃত ৬৬২৪ নম্বর সাফ-কবলা দলিলমূলে ওই জমির মালিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন আনোয়ারুল হক। সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে চুক্তি করে রেজিস্ট্রি করিয়ে দেন শ্রীপুর পৌর এলাকার দলিল লেখক হাফিজ উদ্দিন। তার সনদ নম্বর ২৬৯।

তবে এই বায়া দলিলে বন বিভাগের নামে গেজেটভুক্ত সিএস ৫৩ ও আরএস ১০৬৯ নং দাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সরকার ২০০৬ সালে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে গেজেটভুক্ত বনভূমির নামজারি ও জমাভাগ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ভূমিদস্যু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। এতে বেহাত হচ্ছে বিপুল বনভূমি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাব-রেজিস্ট্রারের নির্দেশনায় গেজেটভুক্ত বনভূমির সিএস দাগের পরিবর্তে একটি এসএ জোত দাগ বসিয়ে ও আরএস দাগ ঠিক রেখে দলিল জমা দেওয়া হয়। পরে তার স্বাক্ষরে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। এতে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়।

অপরদিকে তৌহিদুল আলম মিলকি ওই বনভূমি কেনার আগেই সেখানে গোডাউন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সাতখামাইর বিট অফিসের লোকজন গিয়ে প্রথমে বাধা দিলেও পরে লেনদেনে নীরব হয়ে যান। ইতঃপূর্বে স্টিলের শেড নির্মাণ সম্পন্ন করে তা ডিবিএল গ্রুপের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টির ওপর ঘটনার আড়ালের গত ২৩ ডিসেম্বরের সংখ্যায় একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জবর দখলের মামলা হলেও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়নি।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত তৌহিদুল আলম মিলকি ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, এটা আপনি সরকারকে জিজ্ঞাসা করেন। সরকার আমাকে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দিছে। সরকারকে ১৫ লক্ষ টাকা ফি দিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

শ্রীপুরে বন বিভাগের জমি রেজিস্ট্রিতে সহায়তার দায়ে ২০১৯ সালে ১৫ জন দলিল লেখকের সনদ বাতিল করা হয়। অবসরে যাওয়া সাব-রেজিস্ট্রার নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগের সত্যতা পায় নিবন্ধন অধিদপ্তর। সনদ বাতিল হওয়া দলিল লেখকদের মধ্যে হাদিউল ইসলাম অন্যতম। পরে তিনি বহাল হয়ে আবারও একই অপরাধে মগ্ন হন।

এ ব্যাপারে দলিল লেখক হাদিউল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি। বনভূমি বিক্রেতা আবদুর রহিম নাহিদের মোবাইল নম্বর না পাওয়ায় তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, গেজেটভুক্ত বনভূমির দলিল রেজিস্ট্রি করার কোনো সুযোগ নেই। এই রকম কোনো দলিল এখানে হয়েছে কি না, আমি দেখব।

উল্লেখ্য, আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সেসব উদ্ঘাটনে কাজ করছে ঘটনার আড়ালে।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker