গাজীপুরের ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে ‘বর্জ্যের ভাগাড়’ নির্মাণ করছে সিটি করপোরেশন!
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : স্থানটি আইনগতভাবে সংরক্ষিত। শুধু বন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্যই নয়, নির্মল অক্সিজেন উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখতে জনস্বার্থেও। কিন্তু এটা যাদের অনুধাবন ও রক্ষায় সহায়ক হওয়ার কথা, তারাই যদি বিপরীতমুখী অবস্থান নেন, তাহলে দুর্দশার পথ তো প্রশস্তই হয়!
গাজীপুর মহানগরীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে খোদ সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের ভাগাড় নির্মাণকে কেন্দ্র করে সচেতন মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পশ্চিম পাশের বাউন্ডারি ওয়ালের ভেতরে জনসাধারণের কৃষি জমি রয়েছে। সেখানে অন্তত পাঁচ বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে বর্জ্যের ভাগাড় নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। গত ১১ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ শ্রমিকদের শেড নির্মাণের কাজ শুরু করলে বন কর্মকর্তারা গিয়ে বাধা দেন। বাধা উপেক্ষা করায় পরদিন শেড অপসারণ করা হয়।
১৩ এপ্রিল ঘটনাস্থলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে প্রায় ২০০ লোক জড়ো হন। তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভেকু দিয়ে বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে বালু ভরাট ও পুনরায় শেড নির্মাণের কাজ শুরু করে। পরদিন একদল লোক রেঞ্জ অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি দেন। পরে সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মাদ রাশিদ আরিফ, জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম, ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম রাশেদ সাদাত ও পার্ক বিট কর্মকর্তা আশানুর তুহিন নগর ভবনে গিয়ে সংরক্ষিত বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেও দায়িত্বশীলরা তা আমলে নেননি।
সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে মহাসড়কের পাশে বর্জ্য দেখে ডাম্পিং স্টেশন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই জাতীয় উদ্যানের ভেতরেই ডাম্পিং স্টেশন করা হবে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ব্যতীত কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তবে বন কর্মকর্তারা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের নির্দেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে জাতীয় উদ্যানের মতো সংরক্ষিত স্থানের ভেতরেই সিটি করপোরেশনকে এটা করতে হবে। আইন মেনে ডাম্পিং স্টেশন করার মতো অনেক জায়গা অন্যত্র আছে।
এদিকে বন কর্মকর্তারা প্রথমে শেড অপসারণ করায় তাদের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেয় সিটি করপোরেশন। পরে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ও পরিদর্শক (তদন্ত) মেহেদী হাসান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে বন কর্মকর্তারা আইনগত বাধ্যবাধকতা তুলে ধরেন।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষিত জাতীয় উদ্যান থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত কোর জোন। অভয়ারণ্যে ক্ষতিকর পদার্থ ডাম্পিং ও কোন প্রকার অগ্নিসংযোগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
স্থানীয় বন কর্মকর্তারা বিষয়টির ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকার শিল্প প্রতিষ্ঠান, প্যাথলজি-হাসপাতাল, বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা, পোলট্রি ফার্মের পচা ডিম, উচ্ছিষ্ট, বিষাক্ত সিরিঞ্জ, ব্লেড, ভাঙা কাঁচ, পলিথিন প্রভৃতি ফেলা হলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ ও বায়ু দূষণ হবে। উন্মুক্ত বন্যপ্রাণী ময়লা-আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে। যা বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব হুমকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়াবে। এসব গত ৭ জানুয়ারি জারিকৃত বন অধ্যাদেশেরও পরিপন্থী।
নির্মাণাধীন ডাম্পিং স্টেশনের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ঘন গজারি বন। বনের ক্ষতিও শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (সিটি করপোরেশন-১) রবিউল ইসলাম স্থানটি পরিদর্শনে আসলে বন কর্মকর্তারা তাকে বিস্তারিত অবহিত করেন। পরে তিনি আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় উদ্যান অক্সিজেনের বড় একটি প্রাকৃতিক ভান্ডার। টেকসই ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধির জন্য উদ্যানের ভেতরে থাকা জোতভূমি অধিগ্রহণের একটি প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে রয়েছে। সরকার যখন সারা দেশে বৃক্ষরোপণের বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তখন উদ্যানের ভেতরে অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ড হতাশা সৃষ্টি করছে। ডাম্পিং স্টেশনটি নিরাপদ স্থান ও দূরত্বে করা উচিত।



