গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে বেপরোয়া দখল বাণিজ্যে ফরেস্টার মিজান টইটম্বুর!

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : বনভূমি দখল, বাণিজ্য, মোট দখলের তথ্য গোপন, দখলকারীদের কৌশলে রক্ষা-সবই চলছে গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে। আর এসব হচ্ছে বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন ভাওয়াল রেঞ্জের এই বিট দখলপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর তা ব্যাপক হারে বাড়ে। এর মধ্যে প্রথমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ও পরে লেনদেনে দখল অব্যাহত থাকে।

বিষয়টির ওপর ইতিমধ্যে ঘটনার আড়ালে-তে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দখলকারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না।

সরেজমিনে জানা যায়, বাঘের বাজারের পশ্চিমে স্কুল রোডে চায়না টিন কারখানার উত্তর পাশে সিএস ১৪৫১ নং দাগের সংরক্ষিত বনভূমি। সেখানে প্রায় চার বিঘা বনভূমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করছেন নুরুল ইসলামের স্ত্রী আমেনা খাতুন ওরফে লিটুর মা। এরই মধ্যে তার কাছ থেকে প্লট কিনেছেন প্রায় ২০ জন। ৫ আগস্টের পর আটজন তাতে পাকা ও টিনশেড বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

৫ আগস্টের আগেও কয়েকজন বাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করেছেন। বনভূমি ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন রিবা, রুবেল, হাবিব, আনোয়ার, জলিল, মনির, সাইফুল, রফিক, রাসেল, পারভেজ, হাফিজ, নুরুদ্দিন, সাদ্দাম, ফারুক, রিপন, রাণী ও রাকিব।

বনভূমি কিনে রফিকের নির্মাণাধীন ৩ তলা বাড়ির দোতলার কাজ সম্পন্ন

তাদের মধ্যে রফিক কিনেছেন প্রায় পাঁচ শতাংশ বনভূমি। তার তিন তলা ফাউন্ডেশন বাড়ির দোতলার নির্মাণ কাজ চলতি মাসে সম্পন্ন হয়েছে। বিট কর্মকর্তা উচ্ছেদ ও মামলা না করার কথা বলে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে নতুন দখলকারীদের কাছ থেকে আট লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ।

একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ওই এলাকায় বর্তমানে জমির বিঘাপ্রতি বাজারমূল্য অন্তত চার কোটি টাকা। সে হিসাবে দখলকৃত বনভূমির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা। লিটুর মা এভাবে বনভূমি বিক্রির টাকা দিয়ে নিজেদের জোত জমিতে পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন।

ভবানীপুর বাজারের পশ্চিমে জব্বার ভূঁইয়ার বাড়ির পাশে সিএস ১৪২২ নং দাগের আধা বিঘা বনভূমি কিনে ৫ আগস্টের পর বড় টিনশেড গোডাউন নির্মাণ করেছেন ঢাকার ব্যবসায়ী খোকন মিয়া। দুই কোটি টাকা মূল্যের ওই বনভূমির দখল প্রতিরোধে বিট কর্মকর্তা কোন ব্যবস্থা নেননি।

খোকন মিয়ার গোডাউনের একটু পশ্চিমে মতি ডাক্তারের বাড়ির পাশে একই দাগের প্রায় পাঁচ শতাংশ বনভূমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করেছেন প্যাকলাইন কার্টন কারখানার মালিক মিজানুর রহমান। বিট অফিস প্রথমে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিছুদিন পর লেনদেন করে কাজ সম্পন্ন করা হয়।

নলজানী এলাকার মাদবর এগ্রোর উত্তর পাশে বনভূমি দখল করে চার রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন ইসলাম উদ্দিন। বিট অফিসের বাধায় প্রথমে চালের টিন খুলে রাখা হলেও পরে লেনদেন করে কাজ সম্পন্ন করা হয়।

ইসলাম উদ্দিনের বাড়ির উত্তর পাশে গত ডিসেম্বরে বনভূমি দখল করে টিনশেড মার্কেট নির্মাণ করেছেন আমান ও ইদ্রিস। কাজ প্রকাশ্যে চললেও বিট অফিস কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

বানিয়ারচালায় বনভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে

ভবানীপুর থেকে বানিয়ারচালা রাস্তার প্যারাগন পোলট্রির উত্তর পাশে প্রায় দেড় বিঘা বনভূমি দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করছেন মৃত রফিকুল ইসলাম ওরফে নোয়াখালীর রফিকের চার মেয়ের জামাইয়েরা। তাদের মধ্যে তিনজন প্রবাসী। টিনশেড ও পাকা রুমের সংখ্যা অন্তত ২৪টি। ইতিমধ্যে কিছু রুম ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমান অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। তিনি ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি ভবানীপুর বিটে যোগদানের কিছুদিন পর থেকে বনভূমি দখল বাড়তে থাকে। ৫ আগস্টের পর বিটের বিভিন্ন এলাকায় হাজারো বাড়িঘর, দোকানপাট ও কারখানার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। দখল প্রতিরোধ করার সুযোগ থাকলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ কিছু মহল্লা ব্যতীত অন্য কোথাও আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

সূত্র আরও জানায়, বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের ওপর মহলে আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দখল বাণিজ্য ও মামলা না দেওয়ার কথা বলে দখলকারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উল্টো তাকে একই রেঞ্জের আরেক লোভনীয় বারুইপাড়া বিটে বদলির আদেশ হয়েছে।

রেঞ্জ অফিসের একটি সূত্র জানায়, বনভূমি দখলকারীরা মামলা থেকে বাঁচতে নিজেরা বা দালালদের মাধ্যমে বিট অফিসে লেনদেন করছেন। ভবানীপুর বিটে ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে আছেন বনপ্রহরী শাহজাহান। তিনি বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় স্থাপনাভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা করে আদায় করছেন।

অপরদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বনভূমি জবর দখল সংক্রান্ত তালিকা করা হয়েছে। এতে ভবানীপুর বিটে প্রায় ৫০০ স্থাপনার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। যদিও বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ইতিপূর্বে নতুন হাজার হাজার স্থাপনার কোনায় কোনায় গিয়েছেন বলে ঘটনার আড়ালে-কে জানিয়েছিলেন।

উচ্ছেদ অভিযান : ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে কিছু কিছু অভিযান হচ্ছে। ভবানীপুর বিটে যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় এ পর্যন্ত দুবার অভিযান চালিয়ে সাত একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ৯ জানুয়ারি ভবানীপুরের মোহাম্মদীয়া গার্মেন্টসের উত্তরে ফাইজ উদ্দিনের বাড়ির পাশে আরএস ৮০৫৭ নং দাগে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় ওই দাগের প্রায় চার বিঘা বনভূমি দখল করে নির্মিত ১০ ফুট উঁচু পাকা বাউন্ডারি ওয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধারকৃত ওই বনভূমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় আট কোটি টাকা। গত ২৮ অক্টোবর ঘটনার আড়ালে-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই দখলের সচিত্র তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।

আরও পড়ুন : গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে বিঘার বিঘা বনভূমি দখল, গোপনে চলছে বাণিজ্য

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker