কাপাসিয়া এসিল্যান্ড অফিস ‘ঘুষ সিন্ডিকেটে’ বন্দী, ব্যাপক ভোগান্তি

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতির সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলছে তাদের দৌরাত্ম্য। ফলে হয়রানি ও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সেবাপ্রার্থী জনসাধারণ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অধীনে ইউনিয়ন ভূমি অফিস আটটি। অফিসগুলো থেকে মাসে প্রায় ৮০০ নামজারি ও জমাভাগের প্রস্তাব উপজেলা ভূমি অফিসে জমা হয়। সার্ভেয়ার, কানুনগো ও নামজারি সহকারীদের স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অর্থাৎ এসিল্যান্ড।

অফিসটিতে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের পরামর্শে জমির পরিমাণ অনুযায়ী খারিজের ঘুষের রেট নির্ধারণ হয়। বর্তমানে এক একর পর্যন্ত তিন হাজার টাকা ও এক একরের বেশি হলে ছয় হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। জমি তিন-চার একর বা আরও বেশি হলে ঘুষের রেট কয়েক গুণ বেড়ে যায়। টাকা না পেলে নানা কারণ দেখিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একই পদায়ন আদেশে কর্মরত আছেন মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী মাহবুবুর রহমান, নাজির কাম ক্যাশিয়ার ফারিয়া সরকার ববি ও সায়রাত সহকারী শিব্বির আহমেদ। অন্যরা বদলি হলেও এই তিনজনকে রহস্যজনক কারণে বদলি করা হচ্ছে না।

অথচ ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে সরকারি কর্মচারীদের প্রতি তিন বছর অন্তর বদলির বিধান রয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (মাঠ প্রশাসন-১) হেমন্ত হেনরী কুবি স্বাক্ষরিত পত্রেও বিষয়টি প্রতিপালনের জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাহবুব, ববি ও শিব্বির একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে থাকায় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ঘুষের রেট নির্ধারণে তারা এসিল্যান্ডকে শলাপরামর্শ দিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের কাছে ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অসহায়।

খারিজে কথিত এলআর নামের ওই ঘুষের সঙ্গে জমির পরিমাণ বেশি হলে নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান ও কানুনগো মোহাম্মদ হান্নানকে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মিসকেস ও সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত ডিমারকেশনে চুক্তি করে কাজ করা হয়। চুক্তিতে না গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভোগান্তির যেন শেষ নেই।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্তরা নিজেরা আবেদনকারীদের সঙ্গে লেনদেন বা চুক্তি করেন কম। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী ও দালালদের মাধ্যমে লেনদেন বেশি হয়। এসিল্যান্ড অফিসে এখন ঘুষের ক্যাশিয়ার হিসেবে আছেন উমেদার রাজিব ও নৈশপ্রহরী পলাশ। আগে ক্যাশিয়ার ছিলেন কিছুদিন আগে গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি হয়ে যাওয়া অফিস সহায়ক টুটুল।

তারা আরও জানান, অভিযুক্তরা অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও তাদের বাণিজ্য থামেনি। তারা মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তবে সফটওয়্যারজনিত সমস্যার কারণে বর্তমানে নামজারি অনুমোদনের সংখ্যা কমেছে।

এ ব্যাপারে নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান ঘটনার আড়ালের কাছে দাবি করেন, তিনি এখন নামজারির দায়িত্বে নেই। স্থানীয় দালালদের সঙ্গে আবেদনকারীদের লেনদেন হতে পারে।

এদিকে কয়েকটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে উমেদার নামধারী দালালদের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা অফিসের ভেতরে সরকারি কর্মচারীর মতো চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করেন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারাই তাদের লালনকর্তা।

চাঁদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সোহাগ। এলাকার লোক হওয়ায় সেবাপ্রার্থীরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি অফিস খরচের কথা বলে চুক্তি করে কাজ নেন। পরে তহশিলদার হিসাব বুঝে পেয়ে নথিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে না গেলে আবেদন নামঞ্জুরের সুপারিশ করা হয়।

টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রায়েদ ও সিংহশ্রীসহ তিনটি ইউনিয়নের কাজ হয়। সেখানে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন মাসুদ। বিষয়টি নিয়ে পূর্বে লেখালেখি হলেও তহশিলদারদের আশ্রয়ে তার কিছুই হয়নি।

সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অহিদ। অফিসটিতে দুজন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা রয়েছেন। উপজেলা ভূমি অফিসেও তার সখ্যতা আছে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নূরুল আমিন সাড়ে তিন মাস আগে কাপাসিয়ায় যোগদান করেছেন। জানতে চাইলে তিনি ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। কোন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেননি। সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker