কাপাসিয়া এসিল্যান্ড অফিসে দুর্নীতির রাজত্ব, মাহবুব সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায়?

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতির রাজত্ব চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সেবাপ্রার্থী জনসাধারণের হয়রানি ও ভোগান্তি বাড়ছে।

বিষয়টির ওপর গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ও ৬ মে ঘটনার আড়ালে-তে দুটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে চলে তোলপাড়। পরে শুধু নাজির কাম ক্যাশিয়ার ফারিয়া সরকার ববিকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের লাইব্রেরি শাখায় বদলি করেই দায় সারে কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েক বছর আগে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। সায়রাত সহকারী শিব্বির আহমেদ তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ফারিয়া সরকার ববিকে সরিয়ে দেওয়ার পর নাজির কাম ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পান শিব্বির আহমেদ।

তারা ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি একই পদায়ন আদেশে কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে যোগদান করেন। এরপর তাদেরকে আর কোথাও বদলি হতে হয়নি। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে দাপটের সঙ্গে চলছে রাজত্ব। কোন অভিযোগেই কিছু হচ্ছে না। এমনকি সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম লুৎফর রহমানের দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনও জেলা প্রশাসনে দেড় বছর ধরে চাপা পড়ে আছে।

অথচ ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে সরকারি কর্মচারীদের প্রতি তিন বছর অন্তর বদলির বিধান রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকেও বিষয়টি প্রতিপালনের জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মাহবুবুর রহমান ও শিব্বির আহমেদের খুঁটির জোর কোথায়?

যেভাবে বাণিজ্য : কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অধীনে ইউনিয়ন ভূমি অফিস আটটি। অফিসগুলো থেকে মাসে প্রায় ৮০০ নামজারি ও জমাভাগের প্রস্তাব উপজেলা ভূমি অফিসে জমা হয়। অফিসটিতে বর্তমানে সাধারণ নামজারিতে এক একর পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা ও এক একরের বেশি হলে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। জমির পরিমাণ তিন-চার একর বা আরও বেশি হলে ঘুষের রেট কয়েক গুণ বেড়ে যায়। টাকা না পেলে নানা কারণ দেখিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। কাগজপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

এ ছাড়া খারিজে কথিত এলআর নামের ওই ঘুষের সঙ্গে বেশি জমির ক্ষেত্রে নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান ও সার্ভেয়ার ফারুক আহমেদকে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে হয়। মাহবুবুর রহমান বিভিন্ন মিসকেস থেকেও টাকা হাতিয়ে নেন।

নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান ও নাজির শিব্বির আহমেদ অফিসে ঘুষের রেট নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অর্থাৎ এসিল্যান্ডরা পুরনো কর্মচারী হিসেবে তাদের পরামর্শ নেন। এই সুযোগে অঙ্ক বাড়িয়ে তারা প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। বর্তমান এসিল্যান্ড নাহিদুল হকও তাদের প্রতি বেশ উদার।

অভিযুক্তরা নিজেরা আবেদনকারীদের সঙ্গে লেনদেন করেন কম। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী ও দালালদের মাধ্যমে লেনদেন বেশি হয়। এসিল্যান্ড অফিসে এখন ঘুষের অন্যতম ক্যাশিয়ার হিসেবে আছেন নৈশপ্রহরী পলাশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান ও নাজির শিব্বির আহমেদ অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। তারা মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। নামে-বেনামে গড়ছেন অর্থ-সম্পদ।

সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতে সহযোগিতা : মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী মাহবুবুর রহমানকে চাহিদা মতো টাকা দিলে বড় বড় অবৈধ কাজ বাগিয়ে নেওয়া যায়। এমনই একটি দুর্নীতির ঘটনায় তিনি ধরা পড়েন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে গত দেড় বছরেও তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের বাগেরহাট মৌজার সিএস ৪১২ নং দাগের ২ একর ৯৭ শতাংশ জমি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। এই জমি ১৯৬৭ সালে মতিউর রহমানের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। পরে বন্দোবস্তের শর্ত ভঙ্গ করে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৬৮ সালে তা শামসুল হক চৌধুরীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যার দলিল নম্বর ৪৮। পরে পর্যায়ক্রমে একাধিক ব্যক্তি পৃথক নামজারিমূলে জমির মালিক হন।

এ ঘটনায় স্থানীয় কবির হোসেন ২০২০ সালে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তদন্ত শেষে উপজেলা ভূমি অফিসে একটি মোকদ্দমা দায়ের হয়। মোকদ্দমা নম্বর ৭/২০২১। পরে তৎকালীন এসিল্যান্ড রুবাইয়া ইয়াসমিন শুনানি শেষে ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর রায় দেন।

রায়ে বলা হয়, বন্দোবস্তের শর্ত ভঙ্গের দায়ে মতিউর রহমানের অনুকূলে বন্দোবস্তকৃত এবং পরবর্তীতে সৃষ্ট সকল জোত বাতিল করে ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এ ছাড়া তর্কিত সম্পত্তি বিল শ্রেণির। যা জনসাধারণের ব্যবহার্য।

মোকদ্দমার নথি উপস্থাপনকারী হিসেবে এসিল্যান্ডের আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে মাহবুবুর রহমানের ওপর। কিন্তু তিনি আদেশ বাস্তবায়ন করেননি। এসিল্যান্ড রুবাইয়া ইয়াসমিন বদলি হয়ে চলে গেলে মাহবুবুর রহমান বিবাদী পক্ষের সঙ্গে মোটা অঙ্কের চুক্তি করেন। পরে নিষ্পত্তিকৃত নথি থেকে রায়ের কপি সরিয়ে ফেলে পুনরায় মোকদ্দমা চালু করা হয়।

মাহবুবুর রহমান অভিযোগকারী ব্যক্তিকে ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর উপজেলা ভূমি অফিসে শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য নোটিশ দেন। এরপর নানা কৌশলে চলে সময়ক্ষেপণ। এক পর্যায়ে কবির হোসেন ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মাহবুবুর রহমানের প্রতারণা ও সরকারি সম্পত্তি বেহাতের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

পরে তখনকার ইউএনও এ কে এম লুৎফর রহমান নোটিশ জারি করে তার কার্যালয়ে উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা শেষে তিনি মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। যার স্মারক নম্বর ২০২৪-৯১৫।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পেশকার মাহবুবুর রহমান সরকারি সম্পত্তি সম্পর্কিত বিবিধ মোকদ্দমার আদেশ বাস্তবায়ন না করে ও আদেশের বিষয়টি গোপন করে পুনরায় মোকদ্দমা চলমান রাখেন। তিনি এর কোন ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেননি। যা তার অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অবহেলা এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর পরিপন্থী।

অপরদিকে মাহবুবুর রহমানকে ‘ঘুষখোর’ আখ্যা দিয়ে গত বছরের ১৪ জানুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর সরকার। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পত্রের প্রেক্ষিতে পরের মাসে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ইউএনও তদন্তের জন্য এসিল্যান্ডকে দায়িত্ব দিলে তা চাপা পড়ে যায়।

অভিযুক্ত মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী মাহবুবুর রহমান প্রতিবারই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার আড়ালে-তে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তারা ওপর মহলে দৌড়ঝাঁপ করে বহাল তবিয়তে থাকেন।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানার সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker