গাজীপুর সদর এসিল্যান্ডের স্বেচ্ছাচারিতায় সেবাপ্রার্থীদের সীমাহীন ভোগান্তি

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরে ভূমিসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সদর উপজেলা ভূমি অফিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার ঘনত্বে এখানে সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা ও বিভিন্ন কাজের চাপ বেশি। তাই অফিসটিতে সাধারণত দক্ষ জনবল পদায়নে দৃষ্টি থাকে কর্তৃপক্ষের।

গাজীপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসের ইতিহাসে এবারই প্রথম ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) মঈন খান এলিস ব্যাপক অদক্ষতার নজির স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে চলছে স্বেচ্ছাচারিতা। ফলে সীমাহীন হয়রানি ও ভোগান্তি পোহাচ্ছেন জনসাধারণ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মঈন খান এলিস গত ৩১ ডিসেম্বর গাজীপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসে যোগদান করেন। যোগ দিয়েই তিনি নিজের খেয়াল-খুশিমত সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন। এতে বিশেষ করে নামজারি আবেদনের জট অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তার দায়িত্বের গত প্রায় আড়াই মাসে প্রায় চার হাজার নথি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।

অফিসটিতে প্রতিদিন সেবাপ্রার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকের আবেদন চার-পাঁচ মাস আগের। দলিলপত্রাদি ঠিক থাকলেও অনেক আবেদন সরাসরি নামঞ্জুর করা হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও দেওয়া হচ্ছে না রিভিউ করার সুযোগ।

জেলার পাড়াগাঁও মৌজায় সাড়ে ৫২ শতাংশ জমির নামজারি ও জমাভাগের জন্য গত ২৯ অক্টোবর আবেদন করেন মালিক আরিফ হোসেন। আবেদন নম্বর ১০৫৫৪৬৯০। আবেদনের পর তদন্ত শেষে বাড়ীয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নামজারির সুপারিশ করে সদর উপজেলা ভূমি অফিসে প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে সার্ভেয়ার ও কানুনগোর স্বাক্ষর শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নথি পাঠানো হয় এসিল্যান্ডের টেবিলে। এসিল্যান্ড মঈন খান এলিস গত ২৯ জানুয়ারি শুনানি নিয়ে প্রায় এক মাস পর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আবেদন নামঞ্জুর করেন।

নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে বলা হয়, নামজারি খতিয়ান থেকে জমি ক্রয় করা হলেও রেকর্ডীয় খতিয়ান থেকে আবেদন করা হয়েছে। তাই পুনরায় সঠিকভাবে আবেদনের পরামর্শ দেওয়া হলো।

আবেদনকারী জানান, তার আবেদন ছিল নামজারি থেকে নামজারির। তিনি আবেদনের সঙ্গে উভয় খতিয়ানের কপি জমা দিয়েছেন। শুনানিতে সব উপস্থাপন করার পরও তার আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

অথচ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ২০২২ সালের ১৭ জুলাই জারিকৃত পরিপত্রে বলা হয়েছে, কোন তথ্যের ঘাটতি থাকলেই বা তুচ্ছ কারণে নামজারি আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না। আবেদনকারীকে যুক্তিসংগত সময় দিতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে আবেদনকারী তথ্য বা কাগজপত্র দাখিলে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় আদেশে নামঞ্জুর করা যাবে। পরবর্তীকালে চাহিত তথ্য বা দলিলপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে পুনরায় নামজারি কার্যক্রম চালু অর্থাৎ রিভিউ করতে হবে।

জয়দেবপুর মৌজায় ৮ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ১৬ জানুয়ারি আবেদন করেন জয়দেব চন্দ্র পাল। আবেদন নম্বর ১১১৫৭৩৩০। গাজীপুর পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুনানি নিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি আবেদন নামঞ্জুর করেন। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে দলিল গ্রহীতা ও আবেদনকারীর নাম ভিন্ন বলে উল্লেখ করা হয়।

আবেদনকারী বলছেন, তার বাবা যতীন্দ্র চন্দ্র পাল হেবা দলিলে তফসিলি জমির মালিক। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ওয়ারিশ সূত্রে ওই অংশের মালিক হন। বাবা ও ছেলের নাম তো ভিন্ন থাকবেই। সব উপস্থাপন করার পরও এসিল্যান্ড মনগড়া আদেশ দিয়েছেন।

জয়দেবপুর মৌজায় ৩৯ অযুতাংশ আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের নামজারির জন্য গত ১৬ জানুয়ারি আবেদন করেন তপতী দেবী। আবেদন নম্বর ১১১৫৬০৭০। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুনানি নিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি আবেদন নামঞ্জুর করেন।

নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে বলা হয়, চুক্তিনামা সংযুক্ত নেই। আবেদিত জমির পরিমাণ সঠিক নেই।

আবেদনকারী জানান, তিনি সাফ কবলা দলিলমূলে ওই ফ্ল্যাটের মালিক। চুক্তিনামা তো ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে মূল মালিকের থাকে। তা ছাড়া জমির পরিমাণ দলিল অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা কীভাবে বেঠিক হলো, এসিল্যান্ড সুনির্দিষ্ট করে বলেননি।

সামান্তপুর মৌজায় ৪০ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ১৯ জানুয়ারি আবেদন করেন লিয়াকত আলী। আবেদন নম্বর ১১১৭০৭৬৫। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুনানি নিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি আবেদন নামঞ্জুর করেন। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে মূল দলিল ব্যাংকে বন্ধক থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

আবেদনকারী বলছেন, তারা তিন ভাই এক দলিলে তফসিলি জমির মালিক। তাদের এক ভাই হিস্যা অনুযায়ী মূল দলিল ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছেন। তিনি তার হিস্যা অনুযায়ী নামজারি চেয়েছেন। মালিকানার সপক্ষে দলিলের সইমোহর নকল জমা দেওয়া হলেও এসিল্যান্ড আমলে নেননি।

জয়দেবপুর মৌজায় ৩৪ অযুতাংশ আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের নামজারির জন্য গত ৩০ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছেন খলিলুর রহমান। আবেদন নম্বর ১০৩৩৯৩৯৭। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর তা এসিল্যান্ড অফিসে আটকে আছে। গত প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসেও অনুমোদন হয়নি।

ভারারুল মৌজায় ৭ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ৩০ অক্টোবর আবেদন করেন আমজাদ হোসেন। আবেদন নম্বর ১০৫৬৬২১৮। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর সার্ভেয়ার গত ১৫ জানুয়ারি ও কানুনগো ১৬ জানুয়ারি স্বাক্ষর করেন। কোন কারণ ছাড়াই নামজারি থেকে নামজারির এই প্রস্তাব এসিল্যান্ড প্রায় দুই মাস ধরে ঝুলিয়ে রেখেছেন।

জয়দেবপুর মৌজায় ৪ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ২৪ অক্টোবর আবেদন করেছেন শামীমা বেগম। আবেদন নম্বর ১০৫২২০৯৯। পৌর ভূমি অফিস থেকে গত ৩০ অক্টোবর প্রস্তাব যাওয়ার পর তা আটকে আছে। নামজারি থেকে নামজারির এই প্রস্তাব প্রায় সাড়ে চার মাসেও অনুমোদন হয়নি।

মজলিশপুর মৌজায় ৪ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ১৯ নভেম্বর আবেদন করেন মাহবুবুর রহমান। আবেদন নম্বর ১০৯১০৯১৮। সালনা ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর গত ২৯ ডিসেম্বর শুনানি হয়েছে। এরপর থেকে কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে।

ভূরুলিয়া মৌজায় ১ শতাংশ ৬৮ অযুতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ১৮ নভেম্বর আবেদন করেন মাহমুদা হক। আবেদন নম্বর ১০৯০০৫৩৮। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ২৩ জানুয়ারি শুনানি করেন। গত দেড় মাসেও প্রস্তাবটি নিষ্পত্তি হয়নি।

ভারারুল মৌজায় ১৮ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ১১ জানুয়ারি আবেদন করেন মনির হোসেন জীবন। আবেদন নম্বর ১১১২৫৬৪৬। পৌর ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ২৯ জানুয়ারি শুনানি করেন। গত প্রায় দেড় মাস ধরে প্রস্তাবটি এসিল্যান্ডের আইডিতে ঝুলে রয়েছে।

আঙ্গুটিয়া মৌজায় ৪ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত ২৫ নভেম্বর আবেদন করেন বাসনা আক্তার। আবেদন নম্বর ১০৯৮০৭৮০। মির্জাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রস্তাব যাওয়ার পর এসিল্যান্ড গত ২ ফেব্রুয়ারি শুনানি করেন। এরপর এক মাস অতিবাহিত হলেও তা নিষ্পত্তি হয়নি।

এসিল্যান্ড মঈন খান এলিসের বিরুদ্ধে এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তিনি নামজারি থেকে নামজারির নথিও শুনানি ছাড়া আদেশ দেন না। এতে নথিজট আরও প্রকট হয়েছে।

ভূমিসেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের ওই পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ই-নামজারি আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রাদি যাচাই অন্তে সঠিক প্রতীয়মান হলে শুনানির প্রয়োজনীয়তা নেই। সর্বশেষ নামজারির ভিত্তিতে নামজারি করা হলে পূর্ববর্তী দলিলসমূহের অনুলিপি দাখিলেরও প্রয়োজনীয়তা নেই।

একাধিক ভূমি কর্মকর্তা ও সেবাপ্রার্থীরা বলেন, বর্তমান এসিল্যান্ড সেবা প্রদানে আন্তরিক না থাকায় জনসাধারণ ব্যাপক ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। জরুরি প্রয়োজনেও জমি বিক্রি কিংবা ব্যাংক ঋণ নিতে পারছেন না। হাজার হাজার নথি মাসের পর মাস আটকে থাকায় এবং তুচ্ছ বা অহেতুক কারণে অনেক আবেদন বাতিল হওয়ায় সরকারও মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব প্রতিকারে কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মঈন খান এলিসের সঙ্গে রবিবার ও সোমবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker