গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসে ‘পালোয়ানের’ লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্য
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : পালোয়ানরা কুস্তি বা মল্লযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করলে রেকর্ড সৃষ্টি হয়, প্রশংসিত হন। আর তারা ক্রীড়ার বৈপরীত্যে যদি উৎপীড়ক হয়ে ওঠেন, তাহলে বিতর্কিত হন, জনআস্থা থেকে ছিটকে পড়েন।
গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান তার চেয়ারে উৎপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। পালোয়ান হিসেবে সেবা খাতে স্বচ্ছতার নজির স্থাপনের বড় সুযোগ থাকলেও তিনি লোভকেই যেন করেছেন পাথেয়!
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান প্রায় আড়াই বছর আগে গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসে যোগদান করেন। যোগদানের পর তিনি ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার ঘুষ-দুর্নীতির কারণে সেবাপ্রার্থী জনসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
জমির নামজারি ও জমাভাগ, মূল জোতের ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং মিসকেসসহ মামলা-মোকদ্দমার তদন্ত প্রতিবেদনে জসিম উদ্দিন পালোয়ানকে ঘুষ দিতে হয়। তাকে দাবিকৃত টাকা না দিলে হয়রানির যেন শেষ নেই।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান জমির নামজারিতে বিভিন্ন হারে ঘুষ নেন। অফিসের ভেতরে সরকারি কর্মচারীর মতো একাধিক বহিরাগত লোক কাজ করেন। বেশির ভাগ লেনদেন তাদের মাধ্যমেই হয়।
গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসে বর্তমানে নামজারি থেকে নামজারিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ২ হাজার টাকা, ৩০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা, ১০০ শতাংশের বেশি হলে ১৫-২০ হাজার টাকা, মূল জোতের নামজারিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা, ৩০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ৩০-৪০ হাজার টাকা, ১০০ শতাংশের বেশি হলে ৭০-৮০ হাজার টাকা, অর্পিত সম্পত্তির অবমুক্ত হওয়া ‘খ’ তফসিলের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা ও ৩০ শতাংশের বেশি হলে ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
এভাবে জমির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে ঘুষের রেটও বাড়তে থাকে। কাগজপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি বা ভলিউম ছেঁড়া থাকলে লাখ লাখ টাকার চুক্তি ছাড়া কাজ হয় না। যা এখন ‘ওপেন সিক্রেটে’ রূপ নিয়েছে।
নগরীর জয়দেবপুর মৌজায় ৩ শতাংশের কিছু বেশি জমির নামজারির জন্য গত বছরের ৩০ জুন আবেদন করেন আমিরুল ইসলাম। নথি নম্বর ৩১৩১০। পরে সদর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদনের জন্য গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসে পাঠানো হয়।
আবেদনকারী গাজীপুর পৌর ভূমি অফিসে আর্থিক যোগাযোগ করেননি। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান গত ১৯ জুলাই বিপক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ২৯ জুলাই আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কর্তৃক খারিজা পরচার স্ক্যান কপি অস্পষ্ট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় পরদিন আবার একই তফসিলের আবেদন করেন আমিরুল ইসলাম। নথি নম্বর ২৩৫৫। এবার আর্থিক যোগাযোগ করায় ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। গত ৩০ আগস্ট আবেদন মঞ্জুর হয়।
পাজুলিয়া মৌজায় ৪ শতাংশ জমির নামজারির জন্য গত বছরের ২৫ আগস্ট আবেদন করেন মীর নুরুল আলম রাজীব। নথি নম্বর ৭১০২। আবেদনকারী আর্থিক যোগাযোগ না করায় ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিপক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ২ অক্টোবর আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কর্তৃক স্ক্যান কপি অস্পষ্ট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় গত ৯ মার্চ একই তফসিলের দ্বিতীয়বার আবেদন করেন মীর নুরুল আলম রাজীব। নথি নম্বর ২৯৮২০। এবার আর্থিক যোগাযোগ করায় আর হয়রানি পোহাতে হয়নি। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করায় গত ৩০ এপ্রিল আবেদন মঞ্জুর হয়।
সামান্তপুর মৌজায় ৪ শতাংশের কিছু বেশি জমির নামজারির জন্য গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর আবেদন করেন রফিকুল ইসলাম। নথি নম্বর ১০০৩৫। আবেদনকারী আর্থিক যোগাযোগ না করায় ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান গত ২৩ অক্টোবর বিপক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ২৫ অক্টোবর আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কর্তৃক আবেদিত দাগের মূল জোতে জমি না থাকা সংক্রান্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় গত ১৪ মার্চ একই তফসিলের দ্বিতীয়বার আবেদন করেন রফিকুল ইসলাম। নথি নম্বর ৩০৪২৬। এবার আর্থিক যোগাযোগ করায় দাগের মূল জোতে জমি খুঁজে পেয়েছেন জসিম উদ্দিন পালোয়ান। তিনি পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করায় গত ৮ মে আবেদন মঞ্জুর হয়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান ঘুষ না পেলে হুঁশ হারান। নানা ছুতা দেখিয়ে মানুষকে হয়রানি করেন। জনস্বার্থে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভূমি অফিস সূত্র জানায়, গাজীপুর পৌর ভূমি অফিস থেকে বর্তমানে মাসে পাঁচ শতাধিক নামজারির প্রস্তাব এসিল্যান্ড অফিসে যায়। কিছু থাকে ব্যক্তিবিশেষের। বাকিগুলো থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। বাণিজ্যের বড় অংশ হাতিয়ে নেন জসিম উদ্দিন পালোয়ান।
সূত্র আরও জানায়, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান ভূমি উন্নয়ন কর থেকেও বাণিজ্য করছেন। তার সঙ্গে চুক্তি করলে মূল জোতের খাজনা অনেক কমে যায়। শ্রেণি আবাসিক থাকলে হয়ে যায় কৃষি-২। কম টাকার রসিদ দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর ফলে সরকার প্রতি বছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান ঘটনার আড়ালের কাছে দাবি করেন, তার দৃষ্টিতে যেটা সঠিক, তিনি সেটা করেন। কোনো কারণে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলে সংশোধন করে দেওয়া হয়। লেনদেন হয় না।



