কাপাসিয়ার সনমানিয়া ভূমি অফিসে খবীর-অহিদের দুর্নীতির সিন্ডিকেট, জনসাধারণ জিম্মি
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : তিনি কোনো সরকারি কর্মচারী নন, ভাবসাব কর্মচারীর মতো। অফিশিয়ালি তার কোনো আসন নেই, বসেন তহশিলদারের সঙ্গে। তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, কিন্তু কবজায় থাকে নথিপত্র।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিয়মিত চিত্র এটা। অভিযুক্ত অহিদুজ্জামান খান আড়াল এলাকার মৃত আবদুর রহমান খানের ছেলে। তিনি দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে অফিসটিতে দালালি ব্যবসা করছেন। অসৎ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে কায়েম করেছেন আধিপত্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস আগে আর্থিক হিসাব-নিকাশে দুর্বল ছিল। গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও জমির দাম বাড়ায় পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অহিদ একসময় ফেরি করে ওষুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ভূমি অফিসে আসা-যাওয়া থেকে সখ্যতা হয়। ২০০৫ সালের দিকে উমেদার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বড় দালাল।
অহিদ সরকারি কর্মচারীর মতো নিয়মিত অফিস করেন। অপরিচিত লোকজন তাকে সরকারি লোক হিসেবেই জানেন। তিনি নামজারি ও জমাভাগের প্রস্তাবপত্র তৈরি করেন, মামলা-মোকদ্দমার প্রতিবেদনের জন্য ফাইল নিয়ে তহশিলদারের সঙ্গে তদন্তে যান, তহশিলদারের অনলাইন আইডি ব্যবহার করে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানের কাজও করেন। এসব কারণে অনেকে তাকে ‘ছোট নায়েব’ বলেও ডাকেন।
বিভিন্ন এলাকার সেবাপ্রার্থীরা জমির নামজারির জন্য অহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি চুক্তি করে কাজ নেন। পরে অনলাইনে আবেদন থেকে উপজেলা ভূমি অফিসের অনুমোদন পর্যন্ত সব করে দেন। চুক্তির টাকা থেকে ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে নির্ধারিত অংশ দিয়ে বাকি টাকা পকেটে পুরেন।
কোনো সেবাপ্রার্থী তহশিলদারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও অহিদকে দেখিয়ে কথা বলতে বলা হয়। তার সঙ্গে চুক্তি না করলে সেবা সহজে মেলে না। বাড়তে থাকে হয়রানি। বিভিন্ন কাজের বেশির ভাগ লেনদেন তার মাধ্যমেই হয়।

অফিসে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত খবীর উদ্দিন মোল্লা ও অহিদুজ্জামান খান
মির্জানগর মৌজায় ১ একর সাড়ে ৬৬ শতাংশ জমির নামজারির জন্য অহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্থানীয় রমিজ উদ্দিন ও তার ভাই আবদুল রশিদ। চুক্তি হয় ৪০ হাজার টাকা। অহিদকে দুই দফায় টাকা দেওয়া হয়।
তারা তিন ভাই ও মাসহ চারজনের নামে নামজারির আবেদন করা হয় ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর। আবেদন নম্বর ৫৮৭২০২৯। তখনকার ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি নামজারির প্রস্তাব অনুমোদন হয়। নামজারিতে তাদের পিতার নাম ভুল হওয়ায় তা সংশোধিত হয় ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর। অফিসে যোগাযোগ করার পরও অহিদ সংশোধনের বিষয়টি না জানানোর কারণে সেবাপ্রার্থীরা দুশ্চিন্তায় পড়েন।
গত বছরের ২ জুন ওই নামজারির খতিয়ানভুক্ত জমির ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া হয়। সেবাপ্রার্থী রমিজ উদ্দিন ও আবদুল রশিদ অফিসে গিয়ে প্রথমে অহিদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে অহিদ ভূমি সহকারী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। খবীর উদ্দিন মোল্লা ১৮ হাজার টাকা দাবি করলে দরকষাকষি শেষে ১৩ হাজার টাকায় রাজি হন।
সেবাপ্রার্থীরা অফিসের ভেতরেই অহিদের হাতে ১৩ হাজার টাকা তুলে দেন। অহিদ তাদের সামনেই সেই টাকা দেন খবীর উদ্দিন মোল্লার হাতে। পরে খাজনা দাখিলের রসিদ দেওয়া হয় মাত্র সাত হাজার ৬৪০ টাকার। করবর্ষ কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্বের বাকি পাঁচ হাজার ৩৬০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ নিয়ে তারা আপত্তি জানালে খবীর উদ্দিন মোল্লা পাত্তা দেননি।
রমিজ উদ্দিন গং আরও প্রায় ৫০ শতাংশ জমির নামজারির জন্য অহিদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এবার অহিদের দাবি ২৮ হাজার টাকা। আবেদনের আগেই তিনি ১০ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়েছেন। তাদের দাবিকৃত টাকা দিতে গিয়ে সেবাপ্রার্থীদের ঋণও করতে হয়েছে।
গত বছর চন্ডালহাতা মৌজায় পৌনে দুই একর জমির নামজারির জন্য অহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আহসান উল্লাহ। অহিদ প্রথমে তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেন। পরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক নজরুল ইসলামের মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
নামজারি অনুমোদনের পর চলতি বছর শিক্ষক আহসান উল্লাহ জমির খাজনা দেওয়ার জন্য সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। তখন ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লা তার কাছে ৪২ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকার পরিমাণ অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি চলে যান। পরে দলিল লেখক নজরুল ইসলামের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে খাজনা দাখিল করা হয়।
সনমানিয়া মৌজায় ছয় বিঘা জমির নামজারির জন্য ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বৃদ্ধ ছমির উদ্দিন প্রধান। খবীর উদ্দিন মোল্লা তার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকার পরিমাণ বেশি হওয়ায় তিনি এখনো আবেদন করেননি।
ছমির উদ্দিন প্রধান ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া কিছু হয় না। বেশি টাকা চাওয়ার কারণে অনেকে খারিজ করতে পারছেন না। তিনি ইতঃপূর্বে ২ একর ৭০ শতাংশ জমির খারিজ অন্য একজনকে দিয়ে করিয়েছেন। ওই লোক ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
আড়াল বাজারে অবস্থিত সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পাশে ৫২ শতাংশ আয়তনের একটি সরকারি পুকুর। স্থানীয় থাইল্যান্ডপ্রবাসী কাজল বেপারী পুকুরটি লিজ নেওয়ার জন্য অহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অহিদ ৯৯ বছর অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কথা বলে দাবি করেন ২৫ লাখ টাকা। পরে তাকে কয়েক দফায় ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
এরই মধ্যে অহিদ প্রথমে তিন বছরের জন্য লিজ অনুমোদন হয়েছে বলে কাজল বেপারীকে দলিলের একটি ফটোকপি দেন। তিন বছর পার হওয়ার পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুমোদন হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু তাকে মূল দলিল ও পুকুরের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
ইতোমধ্যে লিজের তিন বছর পার হয়েছে। কাজল বেপারী ছুটি নিয়ে দেশে এসে ভূমি অফিসে যান, অহিদের কাছে ধরনা দেন, কিন্তু আর কিছুই হয় না। এখন টাকা ফেরত চাইলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
খাসপুকুর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকার বিষয়টি জানালে কাজল বেপারী ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তিনি তা জানেন না। অহিদ মিথ্যা কথা বলে টাকা নিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন।
এদিকে অহিদ ব্যবসায়ী পরিচয়ে পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একটি চান্দিনা ভিটি লিজ নিয়েছেন। কিন্তু তিনি লিজের শর্ত অনুযায়ী কোনো ব্যবসা করেন না। দালালির সুবিধার জন্য সেখানে অফিস খুলে বসেছেন।
অহিদ ও ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লা বাজারের চান্দিনা ভিটি লিজ দেওয়ারও বাণিজ্য করছেন। এ ছাড়া তারা লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বিরোধপূর্ণ জমি প্রতিপক্ষের নামে নামজারি করিয়ে দেন বলে অভিযোগ।
ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লা ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগদান করেন। তিনি আগে থেকেই ঘুষ-দুর্নীতিতে আলোচিত। কর্তৃপক্ষ সোচ্চার না হওয়ায় তার দৌরাত্ম্য থামছে না।
অহিদ ভূমি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব অপকর্মের মাধ্যমে জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। পৈতৃক ভিটায় নির্মাণ করছেন ফাউন্ডেশন বাড়ি। দুর্নীতি দমন কমিশনের গাজীপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে চান্দিনা ভিটি লিজ-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়েছিলেন। তখন তারা অহিদের বাড়িতেও যান, বাড়ির ছবি ধারণ করেন। সে যাত্রায় অহিদ টাকা দিয়ে রক্ষা পান বলে প্রচার রয়েছে।
গত বছর অহিদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল। পরে তখনকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নূরুল আমিন সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তদন্তে যান। ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লা এসিল্যান্ডকে জানান, অহিদ নামের কেউ অফিসে কাজ করেন না। একজন অহিদ আছেন, তিনি এলাকায় থাকেন। কোনো কাজ থাকলে মাঝেমধ্যে অনুরোধ করেন। অথচ ওই সময় অহিদ পাশের কক্ষে কাজ করছিলেন।
এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খবীর উদ্দিন মোল্লা ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, অহিদ তার যোগদানের অনেক আগে থেকেই অফিসে কাজ করছেন। তিনি লেনদেনের বিষয়ে কিছুই জানেন না।
অভিযুক্ত দালাল অহিদুজ্জামান খানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।
এলাকাবাসী বলছেন, অহিদ ভূমি কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্যের বড় হাতিয়ার। তাই তারা অহিদকে লালন করেন। সেবাপ্রার্থী জনসাধারণ চক্রটির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জনস্বার্থে সনমানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে দ্রুত দালালমুক্ত ও দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।



