গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে লাগামহীন দখল বাণিজ্যে বনের সর্বনাশ

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের ভাওয়াল রেঞ্জের ভবানীপুর বিটে বনভূমি দখল থামছেই না। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাণিজ্যের নেশা বেড়েই চলছে। বেহাত হচ্ছে বিঘার বিঘা বনভূমি।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের এই বিট দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বেশি দখলপ্রবণ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যথাযথ নজরদারি না থাকায় দৌরাত্ম্য এখন লাগামহীন।

সরেজমিনে জানা যায়, ভবানীপুর বিটের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে বনভূমি দখল করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণ করা হচ্ছে। বেশির ভাগ দখলকারী স্থাপনা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন। ওপরের চাপ না থাকায় বিট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছেন। বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে গোছাচ্ছেন নিজেদের আখের।

শিরিরচালা এলাকার ইভিন্স টেক্সটাইল কারখানার পেছনে ওসির ভিটার পাশে প্রায় আধা বিঘা বনভূমি দখল করে রেখেছেন স্থানীয় রেজাউল হক। তিন মাস আগে চারটি পাকা রুম নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি আরও দুটি রুম নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

শিরিরচালার কেনুপাড়ায় সিএস ২২২ নং দাগের চার শতাংশ বনভূমিতে গত রমজানে তিন রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করছিলেন বাচ্চু মিয়া। খবর পেয়ে বিট অফিস কাজ বন্ধ করে দেয়। সম্প্রতি বিট অফিসের অনুমতি নিয়ে কাজ সম্পন্ন করে রুমগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

বনভূমিতে বাচ্চু মিয়ার নির্মাণাধীন বাড়ির কাজ সম্পন্ন

মেম্বারবাড়ী থেকে ফিনিক্স হ্যাচারির রাস্তার দক্ষিণ পাশে বনভূমিতে চার রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন আসিফ। তার কাজ রিংটন পর্যন্ত উঠে গেছে। আসিফের বাড়ির পাশে বনভূমিতে চার রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন মুকুল।

সাবাহ গার্ডেনের পেছনের দিকে মাটির স্কুলের দক্ষিণে খোরশেদের বাড়ির পাশে স্থানীয় একজনের কাছ থেকে ঢাকায় বসবাসকারী এক ব্যক্তি ১০ শতাংশ বনভূমি কিনেছেন। সেখানে রঙিন টিন দিয়ে তিন রুমের বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে।

সাবাহ গার্ডেনের অদূরে বনভূমি কিনে নির্মাণাধীন বাড়ি

ভবানীপুর বাজারের পূর্ব পাশে সিএস ১৪০৫ নং দাগের বনভূমিতে দুই মাস আগে বারান্দাসহ ছয়টি রুম নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া। তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে বনভূমিতে এক মাস আগে দুটি রুম নির্মাণ করেছেন শেফালী। জাহাঙ্গীর ভূঁইয়ার বাড়ির উত্তর পাশে বনভূমিতে আগের তিন রুমের সঙ্গে বারান্দাসহ নতুন আরেকটি রুম নির্মাণ করেছেন নূরুজ্জামান ভূঁইয়া।

বনভূমিতে নবনির্মিত নূরুজ্জামান ভূঁইয়ার বাড়ি

শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার বাড়ির দক্ষিণ পাশে সিএস ১৪০৫ নং দাগের ১০ শতাংশ বনভূমি দখলে নিয়ে কয়েক মাস আগে ছাদ ঢালাই দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন নূরুল ইসলাম। গত মাসে বাড়ির চারপাশে বারান্দার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

ভবানীপুর এলাকার বিল্লাল কসাইয়ের বাড়ির পূর্ব পাশে সিএস ১২৫৭ নং দাগের প্রায় ১৫ শতাংশ বনভূমি দখল করেছেন রাজু। তিনি গত ঈদের আগে তিনটি রুম নির্মাণের কাজ শুরু করে ঈদের পর সম্পন্ন করেন। ইতিপূর্বে আরও কয়েকটি রুম নির্মাণ করা হয়েছে।

রাজুর বাড়ির পশ্চিম পাশে একই দাগের ১০ শতাংশ বনভূমি দখল করেছেন ফল ব্যবসায়ী আলমগীর। চার মাস আগে বারান্দাসহ তিন রুমের বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।

ভবানীপুর চৌরাস্তার পশ্চিমে সাফারি পার্ক সড়কের উত্তর পাশে সিএস ১০৬৫ নং দাগের পাঁচ শতাংশ বনভূমি কিনে চার মাস আগে দুই রুমের বাড়ি নির্মাণ করেছেন কাঁচামাল ব্যবসায়ী শহীদ। গত ঈদের পর বাড়ির সামনে একটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।

ভবানীপুর বাজারের পূর্ব দিকে বেপারীপাড়ায় আকাশমনি বাগানের ভেতরে প্রায় ১০ শতাংশ বনভূমি দখল করে বসবাস ও ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশে বাড়ি নির্মাণ করেছেন শিউলীর মা। গত রমজানে আরও দুটি রুম নির্মাণ করা হয়েছে। বিট অফিসের লোকজন একবার কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছিলেন। পরে অনুমতি নিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হয়।

ভবানীপুর বিটজুড়ে এ ধরনের দখলের অনেক ঘটনা রয়েছে। গত ৪ মার্চ সাপ্তাহিক ঘটনার আড়ালের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে বনভূমি দখল বেড়েছে, অভিযান বন্ধ থাকায় জমে উঠেছে বাণিজ্য’ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে বিট অফিস বড় স্থাপনাগুলো বহাল রেখে শুধু পাঁচ পীরের মাজারের উত্তর দিকের বনভূমি থেকে শামীমের টিনশেড বাড়ি অপসারণ করে।

অভিযুক্ত শামীম সেখানে প্রায় ১৫ শতাংশ বনভূমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। গত বছরের এপ্রিলে ঘটনার আড়ালে-তে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিট অফিসের নির্দেশে সব স্থাপনা খুলে রাখা হয়। ১০ মাস পর গত ফেব্রুয়ারিতে বিট অফিসের অনুমতি নিয়ে আবার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিট কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনের যোগদানের পর ভবানীপুর বিটে দখল ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বনপ্রহরী শাহজাহান আলী ও মিজানুর রহমান বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা ক্যাশিয়ার হিসেবে বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। রাত বাড়লেই বিট অফিসে বড় দখলকারীদের সঙ্গে চলে বৈঠক।

সূত্র আরও জানায়, বনপ্রহরী শাহজাহান আলী ও মিজানুর রহমান ২০১৮ সাল থেকে প্রায় আট বছর ধরে বিধি বহির্ভূতভাবে একই সার্কেলে আছেন। বিট কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনও আগে একবার এই বিটে ছিলেন। তাদের মিলমিশ বাণিজ্য ডেকে আনছে বনাঞ্চলের সর্বনাশ।

জানতে চাইলে বিট কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। গেজেটভুক্ত জমিতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়। বনপ্রহরী শাহজাহান ও মিজান কারও কাছ থেকে টাকা নেন কি না, আমার জানা নেই।

আরও পড়ুন : গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে ‘বনভূমি দখল ও বাণিজ্য’ জমে উঠেছে

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker