গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট ও কালিয়াকৈরের বারুইপাড়া বিটে বনভূমি দখল, হচ্ছে লেনদেন

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট ও কালিয়াকৈর রেঞ্জের বারুইপাড়া বিটে বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। রক্ষকদের নীরবতায় বেহাত হচ্ছে বনভূমি।

সরেজমিনে জানা যায়, কালিয়াকৈর রেঞ্জের বারুইপাড়া বিটের বিভিন্ন স্থানে বনভূমি দখল বাড়ছে। নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়িঘর। ফলে হুমকিতে পড়ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল।

উলুসরা এলাকার মোখলেস চৌকিদারের ভিটা নামক স্থানে গজারি বনের অংশ দখল করা হচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে বজলুর রহমান, এখলাস মিয়া, মিলন মিয়া, আইয়ুব মিয়া ও ইসমাইল হোসেন পাঁচটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেন। এতে প্রায় ২৫ শতাংশ বনভূমি দখল হয়।

চৌকিদারের ভিটার অল্প দক্ষিণে পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন সোহান মোল্লা। বাড়ির দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে গজারি বন। ইতোমধ্যে নিচ তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। বাড়িটির তিনটি পিলার বনের জমিতে পড়েছে।

সোহান মোল্লা গত এপ্রিলে বাড়ির কাজ শুরু করেন। অভিযোগ পেয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী বন সংরক্ষক শহিদুল হাসান শাকিল ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বন বিভাগের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ করতে বলা হয়।

পরে সোহান মোল্লা ডিমারকেশনের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু ডিমারকেশন অনুমোদন হওয়ার আগেই ছাদ ঢালাই দেওয়া হয়। বিট অফিস কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

উত্তর বারুইপাড়া এলাকার শাহী জামে মসজিদের উত্তরে রাস্তার পাশে আকাশমনি বাগান। সম্প্রতি বাগানের উত্তর পাশের অংশ দখল করে দুটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছেন শাহ আলম ও হানিফ হাওলাদার। এতে প্রায় ১০ শতাংশ বনভূমি দখল হয়েছে।

হাবিবপুর এলাকার শরিফ হোসেন সম্প্রতি আকাশমনি বাগানের অংশ দখল করে একটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এতে প্রায় ৫ শতাংশ বনভূমি দখল হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিট অফিস সোহান মোল্লার কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা নিয়েছে। অন্য স্থাপনাগুলোর কাজ গত ঈদের আগে শুরু হয়ে ঈদের পর সম্পন্ন হয়েছে। বিট অফিসের পক্ষে বনপ্রহরী নূর আহমেদ ওরফে ফটিক দখলকারীদের কাছ থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

সূত্র আরও জানায়, বনপ্রহরী নূর আহমেদের বাড়ি জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাড়ৈগাঁও গ্রামে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়া। বিট কর্মকর্তা মহিদুর রহমানের আমলেও ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

কবিরপুর বাজারের পাশের সেগুন বাগান থেকে ইতঃপূর্বে দুটি গাছ বিক্রি করে দেওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে কর্তনকৃত একটি গাছ জব্দ করে বিট অফিস। অপর গাছ পাচার হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, বনপ্রহরী নূর আহমেদ গোপনে এক ব্যবসায়ীর কাছে ৩০ হাজার টাকায় গাছ দুটি বিক্রি করেন। তদন্ত না হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

বনভূমিতে মিলনের নবনির্মিত বাড়ি। রেঞ্জ অফিসের চাপে ঘরের চালা বহাল রেখে টিনের বেড়া খুলে রাখা হয়েছে।

এদিকে বন কর্মকর্তারা গত ১১ জুন উলুসরা এলাকায় অভিযান চালান। অভিযানে বজলুর রহমান ও এখলাস মিয়ার ঘরের টিনের বেড়া অপসারণ করা হয়েছে। অন্যরা ঘরের চালা বহাল রেখে টিনের বেড়া খুলে রেখেছেন। কারও পুরো স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়নি। তাই সুযোগ বুঝে স্থাপনাগুলো আবার তোলার পাঁয়তারা চলছে।

জানতে চাইলে বনপ্রহরী নূর আহমেদ ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর ৯০ ভাগ মিথ্যা।

বারুইপাড়া বিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, আমি নতুন এসেছি। অভিযোগ পেয়ে রেঞ্জ অফিসার ও এসিএফ সব পরিদর্শন করেছেন। যেগুলোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেগুলোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।

রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট : রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও ডিমারকেশন ছাড়াই বড় বড় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিট অফিসের কাছে এসব ঘটলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

রেঞ্জ অফিসের অল্প দক্ষিণে নোয়াগাঁও পশ্চিমপাড়া এলাকার বাইতুন নূর জামে মসজিদের পশ্চিম পাশে পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন ফার্নিচার ব্যবসায়ী সোহেল। ইট, বালু ও খোয়া গজারি বনের ভেতরে স্তূপ করে রাখায় গাছপালার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

বনের ভেতরে সোহেলের নির্মাণাধীন বাড়ির নির্মাণ সামগ্রী

সোহেল বনভূমি ঘেঁষে বাড়িটি নির্মাণের কাজ শুরু করলেও তার ডিমারকেশন নেই। তিনি টিনের বেড়া দিয়ে আধা বিঘা বনভূমি দখল করে রেখেছেন। দখলকৃত বনভূমিতে রয়েছে কাঠের গোডাউন, টিনশেড বাড়ি ও ফার্নিচারের দোকান।

টিনের বেড়া দিয়ে সোহেলের বনভূমি দখল

বলখেলার মাঠ এলাকার মেধা বিকাশ স্কুলের পশ্চিম পাশে বন ঘেঁষে পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জামাল। তারও ডিমারকেশন নেই। নির্মাণ সামগ্রী গজারি বনের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

মেধা বিকাশ স্কুলের পূর্ব পাশে বন ঘেঁষে আরেকটি পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে। সেখানেও ডিমারকেশনের খুঁটি দেখা যায়নি। নির্মাণ সামগ্রী গজারি বনের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের কিছু স্থানে বনের জমি ব্যবহার ছাড়া বাড়িঘর নির্মাণ করা কঠিন। তাই মালিকেরা ডিমারকেশনের জটিলতায় না গিয়ে বিট অফিস ম্যানেজ করেন। তখন স্থাপনাভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে এক-দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

অপরদিকে রাজেন্দ্রপুর বাজারের মসজিদ গলিতে বনভূমি দখল করে গত ১০ জুন রাতে একটি টিনশেড দোকান নির্মাণ করেছেন রিপন। লাল মিয়া নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে বিট অফিসে লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

এ ব্যাপারে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা জুয়েল রানা ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের বাড়ির বিষয়ে শুনে মাপজোখ করা হয়েছে। বাকিগুলো জেনে দেখবেন।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker