কাপাসিয়ায় ‘মিথ্যা চাঁদাবাজি ও চুরির মামলায়’ প্রবাসফেরতের পরিবারকে ব্যাপক হয়রানি
ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ চলছে। আর সেখানে জমি কিনে মিথ্যা চাঁদাবাজি ও চুরির মামলায় ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছেন এক প্রবাসফেরতের পরিবার।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের আমরাইদ এলাকার এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি ন্যায় বিচারের আশায় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। যথাযথ তথ্য-প্রমাণ দিয়েও পাচ্ছেন না প্রতিকার।
সরেজমিনে জানা যায়, আমরাইদ কারিগরি কলেজের পশ্চিমে রাস্তা সংলগ্ন সাড়ে ১০ শতাংশ জমি প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ টাকায় কিনেন হাইলজোর এলাকার সিঙ্গাপুর ফেরত আজাহার। ২০২৩ সালে জমি রেজিস্ট্রির পর ভূমি অফিস থেকে তাদের নামে নামজারি ও জমাভাগ করা হয়। জমির একাংশে নির্মাণ করা হয় দোকানপাট।
কিন্তু হঠাৎ এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান হামিদা খানম ও তার স্বামী ইমাইল হোসেন দুলাল। হামিদা খানম হলেন জমি বিক্রেতা মোস্তফা খান ও আইয়ুবুর রহমানের ছোট বোন। হামিদা দম্পতি ওয়ারিশ সম্পত্তিতে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি করলেও বসবাস করেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে।
আজাহার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করলে হামিদা দম্পতি কাউকে তোয়াক্কা করেননি। এক পর্যায়ে দলিলে বর্ণিত জমির চৌহদ্দির পশ্চিম-উত্তর অংশে জোরপূর্বক ১৪টি আরসিসি পিলার নির্মাণ করা হয়।
ওই ঘটনায় আজাহার থানায় লিখিত অভিযোগ করলে পুলিশ বিবাদীদের থানায় ডাকে। কিন্তু হামিদা খানম ও তার স্বামী তাতে সাড়া দেননি।
পরে আজাহার গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর ৪৭১/২৫। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন।
গত বছরের ১০ আগস্ট আসামিদের জেলা পিবিআই কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য একটি নোটিশ দেন তদন্ত কর্মকর্তা। নোটিশ পেয়েই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। হামিদা দম্পতি ওই দিন পিবিআই কার্যালয়ে না গিয়ে থানা পুলিশ নিয়ে সরাসরি জমিতে চলে যান। রাতে ১২ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করেন চাঁদাবাজি ও চুরির মামলা। মামলা নম্বর ১০ (৮) ২৫।
মামলার আসামিরা হলেন আজাহার, তার স্ত্রী লাইলী আক্তার, বৃদ্ধ বাবা মোহাম্মদ আলী, মা জমিলা খাতুন, পাশের প্লটের মালিক কবির হোসেন, টোক নয়ন বাজার এলাকার মাসুদা খানম, তার স্বামী মুক্তি মাহমুদ, স্থানীয় আইয়ুবুর রহমান, তার ভাই জি এম মোস্তফা খান, মোস্তফা খানের ছেলে মেহেবুর জাহান খান, তাছলিমা খাতুন ও তার ছেলে আলতামাসুল হক উৎস। তাদের মধ্যে সাতজনই বাদীর নিকটজন। মাসুদা খানম তার ছোট বোন, মুক্তি মাহমুদ বোনের স্বামী, আইয়ুবুর রহমান ও মোস্তফা খান বড় ভাই, তাছলিমা খাতুন ভাবি এবং মেহেবুর জাহান খান ও আলতামাসুল হক উৎস ভাতিজা। মামলার পর আইয়ুবুর রহমান স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা গত ২ মে সকালে ও গত ২ আগস্ট বিকেলে বাদীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে তাদেরকে হুমকি এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়। গত ৩ আগস্ট বিকেলে প্রাচীরের ছয়টি পিলার ভেঙে জমি দখল করার জন্য স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলে। ৪ আগস্ট রাতে পাঁচ টন রড, সোয়া চার লাখ টাকার শিকল, দোতলা ভবনের একটি রুম থেকে আড়াই লাখ টাকার স্যানিটারি মালামাল, আড়াই লক্ষাধিক টাকার ইলেকট্রিক তার ও চার লাখ টাকার অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেম চুরি করে নিয়ে যান।
এলাকাবাসী জানান, হামিদা খানম ও তার ভাই-বোনদের মধ্যে জমি নিয়ে দীর্র্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এর জেরে জমির ক্রেতারা বিপদে পড়েছেন। আজাহার পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও চুরির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
আজাহারের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মেরুদণ্ডের অসুস্থতার কারণে তিনি সিঙ্গাপুরের চাকরি ছেড়ে দেশে চলে আসেন। ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ও গত বছরের ১৪ এপ্রিল ঢাকার বেসরকারি বিআরবি হসপিটালসে তার দুটি মেজর অপারেশন হয়। অপারেশনের পর থেকেই তাকে দৈনন্দিন কাজকর্মে নিয়ন্ত্রিত থাকতে হচ্ছে। পাঁচ কেজির বেশি ভারী কিছু বহন করা নিষেধ। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও নেই।
আজাহার ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, মেরুদণ্ডের অপারেশনের পর তিনি চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে গত ৩১ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ময়মনসিংহের স্বপ্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুতরাং মামলায় উল্লেখিত ৩ ও ৪ আগস্টের কোন ঘটনায় তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। হামিদা খানমের স্বজনরা যদি কিছু করে থাকেন, তাহলে সেটার দায় তাদের ওপর পড়বে কেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, থানা পুলিশ প্রথমে হামিদা খানমকে সহযোগিতা করতে চায়নি। তার স্বামী ইসমাইল হোসেন দুলাল ওয়াসায় চাকরি করতেন। তিনি ওপর থেকে তদবির ও টাকা খরচ করে মামলা রেকর্ড করান। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আজাহার জানান, তিনি ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদের কাছে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ফিরিস্তি আকারে জমা দিয়েছেন। সুষ্ঠু তদন্ত হলে তারা হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন। তবে হামিদা খানমের স্বামী ইসমাইল হোসেন দুলাল চার্জশিট নিজেদের পক্ষে নিতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে জমি ছেড়ে দিতে নানাভাবে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
জমি সংলগ্ন আমরাইদ-গোসিংগা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন লোকের সঙ্গে উচ্চস্বরে নিজের ক্ষমতা নিয়ে ইসমাইল হোসেন দুলালের দম্ভোক্তি প্রকাশের একটি ভিডিও ঘটনার আড়ালের কাছে এসেছে। এতে কাপাসিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অমিতাভ চৌধুরীকে (বর্তমানে শ্রীপুর থানায়) উদ্দেশ্য করে তাকে বলতে শোনা যায়, এই শুয়োরের বাচ্চা অনে গেছছনাগা এহানতে, তুই গেছত, তোর ওসি গেছে। আমি শুধু সাব-ইন্সপেক্টররে কইছিলাম, অমিতাভরে, আরে শুয়োরের বাচ্চা, জুতা কালি করার দোকান থেকে শুরু কইরা সচিবালয়, এমন কোন জাগা নাই যে আমি ইসমাইল ঢুকতারি না। তুই আমার লগে রাজনীতি করিস না।
কথাবার্তার এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী আজাহার তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলার প্রসঙ্গ আনলে ইসমাইল হোসেন দুলাল বলেন, এইডা না দিয়া আমি পারব না তো। কারণ তোমরা অবৈধভাবে আমার জাগা দখল করছো। এহন তোমরা এস্টাবলিশ করো যে তোমরা চাঁদাবাজি করো নাই।
এদিকে হামিদা খানমের মামলার স্বপক্ষে থানায় প্রমাণ হিসেবে দাখিলকৃত চুরি যাওয়া নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়ের একাধিক রসিদের কপি সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ভূলেশ্বর এলাকার মেসার্স মাসুদ ট্রেডার্সের। গত ১ জুলাই দেওয়া রসিদে পাঁচ হাজার কেজি রডের দাম দেখানো হয়েছে চার লাখ ২৫ হাজার টাকা।
রসিদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মাসুদ রানার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছেন আজাহার। জবাবে মাসুদ রানা জানান, ইসমাইল হোসেন দুলাল তার কাছ থেকে পাঁচ টন রড ক্রয়ের অগ্রিম রসিদ নিয়েছেন। কিন্তু মালামালের ডেলিভারি নেননি। কাজ ধরলে নাকি ডেলিভারি নেওয়া হবে। কথোপকথনের এই রেকর্ড ঘটনার আড়ালের কাছে রয়েছে।
অর্থাৎ আলোচিত মামলার এক মাস ১০ দিন আগে চুরি দেখানো পাঁচ টন রডের রসিদ নেওয়া হয়েছে। আজাহার মেসার্স মাসুদ ট্রেডার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন মামলা দায়েরের তিন মাস পর গত ৯ নভেম্বর। তিন মাস পরও যেখানে কোন মালামাল সরবরাহ করা হয়নি, সেখানে আগেই মালামাল চুরি দেখিয়ে মামলাটি করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ইতিপূর্বে মামলার বাদী হামিদা খানমের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি একবার বলেন, শুধু আজাহার ও কবির হোসেন তার কাছে চাঁদা দাবি করেছেন। আরেকবার বলেন, আসামিদের মধ্যে কে কে তার কাছে চাঁদা চেয়েছেন, তা মামলায় উল্লেখ করা হয়নি।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই বাবুল আজাদের সঙ্গে মোবাইলে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।



