গাজীপুরের ভবানীপুর বিটে দখল বাণিজ্য চলছেই, আলোচিত ৩ কর্মচারী বহাল তবিয়তে

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : গোপনে বা লুকোচুরি করে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে বনভূমি দখল হচ্ছে। নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। অনেকে স্থাপনা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন, চলছে অবিরত।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন গাজীপুরের ভাওয়াল রেঞ্জের ভবানীপুর বিটে এসব তুঘলকি কাণ্ডে বেহাত হচ্ছে বিপুল বনভূমি। রক্ষকরা ভক্ষকের ভূমিকায় মেতে ওঠায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বন ও পরিবেশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবানীপুর বিটের বিভিন্ন স্থানে গেজেটভুক্ত ও সংরক্ষিত বনভূমি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। গত দেড় বছরে দখল ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আগে উচ্ছেদ অভিযান হলেও এখন অভিযান হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষও অনেকটা উদাসীন। এই সুযোগে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন। ঘটনার আড়ালে-তে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে কর্মকর্তারা কিছু দৌড়ঝাঁপ করেন। কিছু মামলাও দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর তৎপরতা থেমে যায়। কিন্তু দখল আর থামে না।

গাজীপুর সদর উপজেলার শিরিরচালা এলাকার কেনুপাড়ায় সিএস ২২২ নং দাগের ৫ শতাংশ বনভূমি কিনেছেন কিশোরগঞ্জের মোবারক। তিনি গত বছর তিন তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তখন যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে বিট অফিসের লোকজন গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।

বনভূমিতে মোবারকের নবনির্মিত বাড়ি

পরে মোবারক চলতি বছর বিট অফিসে যোগাযোগ করে আবার কাজ শুরু করেন। বাড়িটির কাজ সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। তার দখলকৃত বনভূমির স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

কেনুপাড়ার মিনার বাড়ির উত্তর পাশে সিএস ২২২ নং দাগের ৮ শতাংশ বনভূমি কিনেছেন খুলনার ওয়াহিদ গাজী। তিনি সেখানে গত বছরের শেষ দিকে পাঁচ রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। তার দখলকৃত বনভূমির বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

বনভূমিতে ওয়াহিদের নবনির্মিত বাড়ি

কেনুপাড়ার সিকদার বাড়ির পূর্ব দিকে সিএস ২২২ নং দাগের বনভূমি দখল করে বাড়ি সম্প্রসারণ করেছেন রিপন মিয়া। নতুন চারটি রুমের নির্মাণ কাজ শুরু হলে বিট অফিসের লোকজন গিয়ে তা বন্ধ করে দেন। পরে এক দালালের মাধ্যমে বিট অফিসে যোগাযোগ করে গত মাসে কাজ সম্পন্ন করা হয়।

বনভূমিতে রিপনের নবনির্মিত বাড়ি

কেনুপাড়ার সিকদার বাড়ির পূর্ব দিকে সিএস ২২২ নং দাগের বনভূমি দখল করে দুই মাস আগে ছয় রুমের টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছেন মাসুদ মিয়া। বাড়িটিতে ব্যবহার করা হয়েছে রঙিন টিন। রুমগুলো ভাড়াও দেওয়া হয়েছে।

বনভূমিতে মাসুদের নবনির্মিত বাড়ি

শিরিরচালা এলাকার আকনপাড়ার হাবিবের শ্যালক তার বাড়ির উত্তর পাশে সিএস ২২২ নং দাগের প্রায় ১৫ শতাংশ বনভূমি কিনেছেন। চার মাস আগে সেখানে ১০ রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি আরও দুটি রুম নির্মাণ করেছেন। তার দখলকৃত বনভূমির বাজারমূল্য প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা।

আকনপাড়ার মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে একই দাগের ৫ শতাংশ বনভূমি দখল করে গত জুনে টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া মসজিদের পূর্ব পাশে বনভূমি দখল করে চলতি বছর দুই রুমের পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন নাসির।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিট অফিসের অনুমতি ছাড়া বনভূমিতে বাড়িঘর বা মার্কেট নির্মাণ করা যায় না। স্থাপনাভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা লেনদেন হয়। বনপ্রহরী শাহজাহান আলী, মিজানুর রহমান ও জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট রবি দাস ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে আছেন।

এদিকে বনপ্রহরী শাহজাহান আলী ও মিজানুর রহমান বিধিবহির্ভূতভাবে একই সার্কেলে আট বছর ধরে কর্মরত আছেন। ইতঃপূর্বে শাহজাহান আলী, মিজানুর রহমান ও রবি দাসকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। পরে অল্প সময়েই সেই আদেশ বাতিল হয়। এতে তাদের দাপট আরও বেড়ে যায়।

বিট কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সম্প্রতি ঘটনার আড়ালের সম্পাদক রুবেল সরকারকে ফোন করে দাবি করেন, তিনি বাড়িঘর থেকে এক টাকাও নেন না। তার বিরুদ্ধে বাড়িয়ে লেখা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো যাচ্ছে না।

বিট কর্মকর্তা আরও বলেন, গেজেটভুক্ত বনভূমির সিএস ও আরএস রেকর্ড পাবলিকের নামে। কারও কারও ভূমি অফিসের খাজনার রসিদ আছে। আমি চাইলেই কাজ বন্ধ করতে পারি না। মামলা দিচ্ছি।

উল্লেখ্য, গেজেটভুক্ত বনভূমির খাজনা-খারিজ ২০০৬ সাল থেকে সরকারি নির্দেশে বন্ধ রয়েছে। এরপরও মাঝেমধ্যে গোপনে খাজনার রসিদ দেওয়া হয়। তবে গেজেট থেকে কোনো দাগ অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই ভূমির স্বত্ব বন বিভাগের। তা ছাড়া আরএস জরিপে অনেক দাগের ভূমি সম্পূর্ণ বা আংশিক বন বিভাগের নামে রেকর্ড হয়েছে। রেকর্ড সংশোধনীর অনেক মামলাও আদালতে বিচারাধীন।

এ ব্যাপারে ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তিনি ঘটনার আড়ালে-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সূত্রে যেসব দখলের তথ্য জানতে পারছেন, সেসব ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিছু মামলাও দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।

আরও পড়ুন : গাজীপুরের ভবানীপুর বিট এখন দখলের রাজ্য, বিট কর্মকর্তা নাসির বেসামাল!

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker