গাজীপুরের রাণী বিলাসমণি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘কোচিংবাজ’ শিক্ষকদের দৌরাত্ম্য চরমে

ঘটনার আড়ালে প্রতিবেদন : রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গাজীপুর শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভিভাবকরা ভালো পড়ালেখার স্বপ্ন নিয়ে সন্তানদের এখানে ভর্তি করেন। পরে কিছু শিক্ষকের ব্যবসায়িক চিন্তায় তারা আশ্চর্য হন। বাধ্য হয়ে দিতে হয় কোচিং সেন্টারে।

রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোচিংবাজ শিক্ষকদের দৌরাত্ম্য চলছে। আইনে কঠোরভাবে নিষেধ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রভাতী ও দিবা শিফটে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪০০-এর অধিক। কিছু শিক্ষক নিজেরা সাইনবোর্ডবিহীন কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। তারা ক্লাসরুমে শিক্ষাদানে কম মনোযোগী। তাদের কোচিংয়ে পড়লে ফলাফল ভালো হয় বলে প্রচার রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে কোচিংয়ে ঝুঁকে পড়ে।

ভাওয়াল রাজবাড়ির পূর্ব দিকে জোড়পুকুর সড়কে টাঙ্গাইল শাহীন স্কুল। স্কুলটির পূর্ব পাশের গলি দিয়ে ঢুকলইে অ্যাডভোকেট হযরত আলীর বাড়ি। এই বাড়ির নিচ তলায় রুম ভাড়া নিয়ে কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন খান। তিনি রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষক।

জসীম উদ্দিন খানের কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ১০০। সবাই রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের। সকাল থেকে একাধিক ব্যাচে দিবা শিফটের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। তিনি শিক্ষার্থীপ্রতি দেড় হাজার টাকা থেকে দুই হাজার টাকা নেন। মাসে তার বাণিজ্য লক্ষাধিক টাকা।

জসীম উদ্দিন খান ২০১১ সালের ২৮ মার্চ থেকে রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে আছেন। তার নিজ জেলা গাজীপুর। তিনি শাহীন স্কুলের গলিতে বেশ কয়েক বছর ধরে কোচিং করাচ্ছেন। বিষয়টি ২০২২ সালে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওঠে আসলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভূগোলের সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শিবলী রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে আছেন ২০০৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে। তার নিজ জেলা ময়মনসিংহ। তিনি আগে শাহীন স্কুলের গলিতে জসীম উদ্দিন খানের সঙ্গে রুম ভাড়া নিয়ে কোচিং করাতেন। পরে অভিযোগ উঠলে তরুবীথি এলাকার নিজের বাড়িতে চলে যান।

আসাদুজ্জামান শিবলীর কোচিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। তিনি বিজ্ঞান ও গণিত পড়ান। শিক্ষার্থীপ্রতি নেন দেড় হাজার টাকা। তার মাসে বাণিজ্য প্রায় পৌনে এক লাখ টাকা।

গণিতের সিনিয়র শিক্ষক ছাইদুল ইসলাম ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে আছেন। তার নিজ জেলা ময়মনসিংহ। তিনি হাক্কানী সোসাইটি এলাকার ভাড়া বাসায় একাধিক ব্যাচে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে পড়ান। শিক্ষার্থীপ্রতি নেন এক হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা।

ইংরেজির সিনিয়র শিক্ষক নাছরীন আনজুমান রুনী রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে আছেন ২০০৬ সালের ১৬ জুলাই থেকে। চলতি মাসে একই প্রতিষ্ঠানে তার ২০ বছর পার হয়েছে। তিনি গণিতের সহকারী শিক্ষক মাহমুদা পারভীন ও শারীরিক শিক্ষার সহকারী শিক্ষক মাহমুদা বেগমকে নিয়ে কোচিং চালাচ্ছেন। মাহমুদা পারভীন ২০১০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ও মাহমুদা বেগম ২০১৭ সালের ২৫ মার্চ থেকে এই বিদ্যালয়ে আছেন। সবার নিজ জেলা গাজীপুর।

ওই তিন শিক্ষকের কোচিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক। সব বিষয় বাবদ শিক্ষার্থীপ্রতি নেওয়া হয় দুই হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা। মাসে বাণিজ্য হয় দুই লক্ষাধিক টাকা।

তাদের কোচিং সেন্টার আগে কাজী আজিমউদ্দিন কলেজের পূর্ব পাশে লুৎফর ডাক্তারের বাড়িতে ছিল। বাড়িটিতে বেসরকারি নেক্সাস গ্রামার স্কুলের কার্যক্রমও চলছিল। সম্প্রতি নেক্সাস গ্রামার স্কুল ও কোচিং সেন্টার একসঙ্গে দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকার কাজী নজরুল ইসলাম সরণির ডি-১৪৯/১ নম্বর বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্কুলটিতেও মালিকানা রয়েছে বলে অভিযোগ।

সরকারি সুবিধাভোগী শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জনকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শাস্তির মধ্যে অন্যতম হলো বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতি স্থগিত রাখা এবং চাকরি থেকে সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্তকরণ।

কয়েকজন অভিভাবক বলেন, কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকেরা ক্লাসে মনোযোগ কম দেন। তারা শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে প্রলুব্ধ করেন। একজনের দেখাদেখি আরেকজন কোচিংয়ে যেতে থাকে। যারা কোচিং করে না, তাদের কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই আর্থিক সমস্যা থাকলেও অনেকে বাধ্য হয়ে কোচিংয়ে যায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অন্যায় ও অমানবিক।

বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কোচিংবাজ শিক্ষকদের অনেকে একই কর্মস্থলে এক-দেড় যুগ ধরে বহাল আছেন। তারা নীতিমালা অমান্য করে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়ান। কেউ কেউ বদলি হলেও তদবির করে আবার দ্রুত চলে আসেন। বিদ্যালয়ে তাদের দাপটও বেশি। তারা কাউকে মানতে চান না। ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।

সূত্র আরও জানায়, কোচিংবাজ শিক্ষকদের মধ্যে ২০২২ সালের মার্চে আসাদুজ্জামান শিবলীকে ঢাকায় ও মাহমুদা পারভীনকে নারায়ণগঞ্জে বদলি করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। পরে তারা টাকা দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আদেশ বাতিল করে বহাল থাকেন। চলমান কোচিং বাণিজ্য অব্যাহত রাখার স্বার্থে এসব হচ্ছে।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষক জসীম উদ্দিন খানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি। আসাদুজ্জামান শিবলীকে ফোন করলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলবেন বলেও আর সাড়া দেননি।

শিক্ষক ছাইদুল ইসলাম ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তিনি আগে পটুয়াখালীতে ছিলেন। তখন প্রাইভেট পড়াতেন। নীতিমালা হওয়ার পর আর পড়ান না।

শিক্ষক মাহমুদা বেগম ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তারা আগে কয়েকজনকে পড়াতেন। এখন কাউকে পড়ান না।

রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরফুদ্দীন আহমদ ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তিনি কোচিং বাণিজ্যের বিষয়ে শুনেছেন। কয়েকজন শিক্ষক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছেন। তারা বিদ্যালয় পরিচালনায় সহযোগিতা করেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এদিকে জীববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক তাহমিনা সুলতানা যুথি বিদ্যালয়টিতে আছেন ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। তার নিজ জেলা মানিকগঞ্জ। তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বলে অভিযোগ।

ইতোমধ্যে তাহমিনা সুলতানা যুথির বিরুদ্ধে একাধিক অভিভাবক প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, তাহমিনা সুলতানা যুথি এক অভিভাবককে ‘বেয়াদব’ ও তার ছেলেকে ‘বেয়াদবের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছেন। এ নিয়ে অভিযোগ করায় তার ছেলেকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

এ ছাড়া তাহমিনা সুলতানা যুথি গত ১ জুলাই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রথম দিন কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্বে ছিলেন। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ২৫ মিনিট পর তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে তাহমিনা সুলতানা যুথিকে গত ৫ জুলাই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। এতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ ও কর্তব্যে চরম অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।

অভিযুক্ত শিক্ষক তাহমিনা সুলতানা যুথি ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে গালি দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি প্রধান শিক্ষকের আর্থিক বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করায় তাকে শোকজ করা হয়েছে। তারা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন না।

বিষয়টি নিয়ে গাজীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আল মামুন তালুকদারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।

আরও খবর

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker